হাবিবুল্লাহ্ সরকার, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা): ভোরের কুয়াশা তখনও কাটেনি। তিস্তার বিস্তীর্ণ বালুচরের ওপর দিয়ে একটি ঘোড়ার গাড়ি ছুটে চলেছে। গাড়িতে বোঝাই ভুট্টার বস্তা, পাশে বসা কৃষক, চোখে-মুখে ক্লান্তি, তবু এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। এই দৃশ্য গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তাপাড়ের চর অঞ্চলের প্রতিদিনের বাস্তবতা। যেখানে আধুনিক সভ্যতার চাকা থমকে যায়, সেখান থেকেই শুরু হয় ঘোড়ার গাড়ির পথচলা।
নদীবেষ্টিত ও দুর্গম তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় যোগাযোগের একমাত্র নির্ভরযোগ্য বাহন হলো ঘোড়ার গাড়ি। পাকা সড়কহীন ধুধু বালুচরের এই প্রতিকূল পরিবেশে মোটরযান চলার কোনো উপায় নেই, তাই স্থানীয় মানুষ আদর করে এই বাহনকে বলেন "চরের জাহাজ"। বর্ষা মৌসুমে নৌকা আর শুকনো মৌসুমে ঘোড়ার গাড়ি— এই দুই বাহনকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় লক্ষাধিক চরবাসীর জীবন।
তিস্তার চরে ধান, গম, ভুট্টা, মরিচ, পেঁয়াজ, তামাক, পাট ও সবজির ভালো ফলন হলেও উৎপাদিত ফসল হাটে নিয়ে যাওয়াই কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় কৃষক আবুল কালাম জানান, ভালো রাস্তাঘাট ও যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় তাঁরা ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না, বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। তরুণ কৃষক আতিকুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ মণ ভুট্টা হবে। কিন্তু যোগাযোগ সংকটের কারণে প্রতি মণে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকার আসে, সরকার যায়, প্রতিনিধিরা ওয়াদা দেয়, কিন্তু পরে আর আমাদের দিকে কেউ দেখে না।”
শুধু ফসল নয়; শহরের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধ, এমনকি নির্মাণ সামগ্রীও চরে পৌঁছায় এই ঘোড়ার গাড়িতে। চরাঞ্চলে কোনো স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা ক্লিনিক না থাকায় গুরুতর অসুস্থ রোগী বা প্রসূতি মায়েদের হাসপাতালে পৌঁছানোর একমাত্র ভরসাও এই বাহন। কোনো অ্যাম্বুলেন্স না আসায় জরুরি মুহূর্তে ঘোড়ার গাড়িই হয়ে ওঠে চরবাসীর ”অ্যাম্বুলেন্স"। স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “গত বছর রাত তিনটায় আমার ছেলের হঠাৎ জ্বর-খিঁচুনি উঠল। কোনো গাড়ি ও রাস্তা না থাকায় পাড়ার লোকজন ঘোড়ার গাড়িতে করেই হাসপাতালে নিয়ে গেল। ওই গাড়ি না থাকলে কী যে হতো ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।” দক্ষ ধাত্রী বা চিকিৎসকের অভাবে এ অঞ্চলে মা ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
চরের শিশুদের জন্য মাইলের পর মাইল বালুচর ও খাল পেরিয়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়া প্রতিদিনের সংগ্রাম। বর্ষায় পথ ডুবে গেলে স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। এই কষ্টের কারণে অনেকে মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে চান না, ফলে ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতিতে কিছু পরিবারের কাছে ঘোড়ার গাড়িই হয়ে উঠেছে "স্কুলবাস"। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ মোস্তফা কামাল বলেন, “দূরত্ব ও বর্ষায় পথ বন্ধ হওয়ার কারণে অনেক শিশু বছরের মাঝপথে আসা বন্ধ করে দেয়। ঘোড়ার গাড়ি চলে এমন দিনগুলোতে উপস্থিতি অনেক বেশি থাকে।” তাছাড়া চরে মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় অষ্টম শ্রেণির পর বহু মেধাবী শিশুর পড়াশোনা প্রাথমিকেই থমকে যায়।
ঘোড়ার গাড়ি শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়, এটি অনেক পরিবারের আয়ের উৎসও। তিস্তার চরে বহু বেকার যুবক ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। একজন দক্ষ চালক প্রতিদিন গড়ে ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা আয় করতে পারেন। পুরোনো মোটরগাড়ির চাকা ব্যবহার করে কাঠ ও বাঁশের কাঠামোয় তৈরি এই গাড়িগুলো কম খরচে একটি টেকসই স্থানীয় সমাধান।
উন্নয়নের ঢেউ যখন শহরে-বন্দরে আছড়ে পড়ছে, তিস্তার বুকের এই চরগুলো তখনও চরম অবহেলায় উপেক্ষিত। স্থানীয়দের দাবি, সরকার যদি চরাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগ দিয়ে একটু ভালো রাস্তা, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে, তবেই লাঘব হবে এই অঞ্চলের মানুষের বহুকালের দুঃখ-কষ্টের গ্লানি।
এআইএল/সকালবেলা