দেশ ঘুরে এবার নরসিংদীতে হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি

প্রকাশ: সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ০৪:৫৪ অপরাহ্ণ
দেশ ঘুরে এবার নরসিংদীতে হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি

বিনোদন প্রতিবেদক : বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত বিনোদনের অন্যতম প্রধান ধারক ও জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’। নব্বইয়ের দশক থেকেই স্টুডিংয়ের কৃত্রিম চার দেয়ালের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত ও ঐতিহাসিক অঞ্চলে গিয়ে এর বৈচিত্র্যময় পর্বগুলো ধারণের এক অনন্য ঐতিহ্য তৈরি করেছেন এর নির্মাতা। তবে দর্শকপ্রিয় এই অনুষ্ঠানটি কখনও কোনো বাণিজ্যিক ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রিসোর্ট, কৃত্রিম পার্ক কিংবা যেকোনো সাধারণ খোলা খেলার মাঠ বা স্টেডিয়ামে ধারণ করা হয় না। কারণ ‘ইত্যাদি’র ধারণ স্থান নির্বাচনের পেছনে সবসময়ই একটি গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিশেষত্ব থাকে। দেশের সুপ্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য-সভ্যতা, লোকশিল্প, গৌরবময় পুরাকীর্তি, দর্শনীয় আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র এবং বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকার অজানা গৌরবগাথা দর্শকের সামনে নিখুঁতভাবে তুলে ধরাই এই নান্দনিক অনুষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য। সেই গৌরবময় ধারাবাহিকতায়, এবারের পবিত্র ঈদুল আজহার বিশেষ জমকালো পর্বটির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে প্রাচীন জনপদ ও ঐতিহ্যের জেলা নরসিংদীকে। সেখানকার রায়পুরা উপজেলার রামনগরে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরের সুবিশাল প্রাঙ্গণেই মূলত তৈরি করা হয়েছিল এবারের চোখধাঁধানো নান্দনিক মঞ্চ।

আজ সোমবার (১ জুন) বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘বিনোদন’ ও ‘টেলিভিশন মাধ্যম’ বিভাগের এক বিশেষ প্রতিবেদনে নরসিংদীতে ধারণকৃত ‘ইত্যাদি’র এই বিশেষ ঈদ পর্বের নানা চমক ও ভেতরের খবর বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘ইত্যাদি’র এই আগমন ও ধারণকে কেন্দ্র করে গোটা নরসিংদী জেলাজুড়ে গত কয়েক দিন ধরে এক অভূতপূর্ব সাজসাজ রব ও উৎসবের আমেজ বিরাজ করছিল। অনুষ্ঠান ধারণের দিন দুপুরের পর থেকেই চারিদিক থেকে লাখো প্রগতিশীল দর্শক অনুষ্ঠানস্থলে দলে দলে হাজির হতে শুরু করেন। প্রতিবারের মতো এবারও দর্শকদের সুশৃঙ্খল প্রবেশের জন্য ছিল বিশেষ শৈল্পিক আমন্ত্রণপত্র বা গেইট পাস। এই বিশেষ আমন্ত্রণপত্রগুলো নরসিংদী জেলা প্রশাসনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষের মাঝে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিলি করা হয়।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ‘ইত্যাদি’র কোনো আমন্ত্রণপত্র বা গেইট পাসের জন্য দর্শকদের কোনো প্রকার অর্থ বা ফি প্রদান করতে হয় না। অনুষ্ঠান শুরুর নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই পুরো জাদুঘর প্রাঙ্গণ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। নরসিংদীর বিভিন্ন দূরবর্তী উপজেলা থেকে আসা স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের ভাষ্য— নরসিংদীর ইতিহাসে এর আগে কোনো সাংস্কৃতিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে এমন স্বতঃস্ফূর্ত ও উপচে পড়া জনসমুদ্রের জোয়ার দেখা যায়নি।

এবারের নরসিংদী স্পেশাল ‘ইত্যাদি’তে দর্শকদের জন্য থাকছে দুটি বিশেষ ও আকর্ষণীয় গান। এর মধ্যে একটি বিশেষ ফোক-ফিউশনধর্মী গান গেয়েছেন নরসিংদীরই কৃতি সন্তান, বর্তমান প্রজন্মের প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক ইমন চৌধুরী এবং তাঁর নিজস্ব জনপ্রিয় বাদ্যদল ‘বেঙ্গল সিম্ফনি’। জুয়েল আহমেদ ও কবির বকুলের যৌথ চমৎকার লেখনীতে এই গানটির দুর্দান্ত সুর ও আধুনিক সংগীতায়োজন করেছেন ইমন চৌধুরী নিজেই।

অন্যদিকে, অনুষ্ঠানের একদম শুরুতেই নরসিংদীর হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাস, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে থাকছে একটি জমকালো ও নান্দনিক পরিচিতিমূলক নৃত্যগীত। মনিরুজ্জামান পলাশের চমৎকার কথায় এই উদ্বোধনী গানটির মূল সুর করেছেন স্বয়ং হানিফ সংকেত এবং এর আবহ সংগীতায়োজন করেছেন তরুণ কম্পোজার মেহেদী। স্থানীয় প্রতিভাবান নৃত্যশিল্পীদের অংশগ্রহণে চমৎকার এই গ্রুপ ড্যান্সের কোরিওগ্রাফি করেছেন এস কে জাহিদ। গানটিতে মূল কণ্ঠ দিয়েছেন তানজিনা রুমা ও জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী রাজিব।

‘ইত্যাদি’র চেনা দর্শক-পর্বের ঐতিহ্যবাহী নিয়ম মেনে, ধারণস্থান নরসিংদী জেলাকে নিয়ে করা তাৎক্ষণিক কুইজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উপস্থিত হাজারো দর্শকের মধ্য থেকে লটারির ভিত্তিতে ৪ জন সৌভাগ্যবান বিজয়ীকে মঞ্চে নির্বাচন করা হয়। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় ভাগে এই নির্বাচিত দর্শকরা নরসিংদীর বিখ্যাত ও বিশ্বখ্যাত কিছু ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় পণ্য নিয়ে তৈরি একটি অত্যন্ত রসাত্মক ও শিক্ষণীয় তাৎক্ষণিক নাট্যাংশে অভিনয় করেন।

শিকড় সন্ধানী ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ সবসময়ই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অন্তরালে থাকা জনকল্যাণে নিবেদিত সাদা মনের মানুষদের আলোর বৃত্তে তুলে ধরার পাশাপাশি নানা অচেনা-অজানা বিষয় ও তথ্যভিত্তিক শিক্ষামূলক প্রতিবেদন প্রচার করে থাকে। আর সেই নিয়মিত ধারাবাহিকতায়, এবারের পর্বেও রয়েছে সমাজ সচেতনতামূলক কয়েকটি অনবদ্য ডকুমেন্টারি। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন প্রত্নস্থল ‘উয়ারী-বটেশ্বর’ এবং সামগ্রিক নরসিংদী জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান-স্থাপনার ওপর একটি সুনির্মিত তথ্যভিত্তিক ভিজ্যুয়াল প্রতিবেদন।

এ ছাড়াও থাকছে নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন তাঁতশিল্প এবং বিশ্বজুড়ে ‘প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার’ নামে খ্যাত ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের হাট ‘বাবুরহাট’কে নিয়ে একটি বিশেষ তথ্যসমৃদ্ধ বাণিজ্যিক আয়োজন। কৃষি খাতের উন্নয়নে রয়েছে নরসিংদীর বিখ্যাত জিআই (GI) পণ্য অমৃতসাগর কলা, সুস্বাদু লটকন এবং সুপরিচিত কলম্বো লেবুর চাষ ও বাজারজাতকরণের ওপর বিশেষ প্রতিবেদন। পাশাপাশি থাকছে এই প্রাচীন জেলার বেশ কয়েকজন দেশবরেণ্য কীর্তিমান ও স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্মের ওপর বিশেষ আলোকপাত।

দেশের ভেতরের প্রতিবেদনের পাশাপাশি এবার রয়েছে খুলনা জেলার বতিয়াঘাটা উপজেলার দৃষ্টিহীন এক ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ বৃদ্ধ চিত্তরঞ্জন মহালদারকে নিয়ে তৈরি করা একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও মানবিক প্রতিবেদন। যিনি কোনো জাগতিক আলো না দেখেও কেবল নিজের অদম্য ইচ্ছেশক্তি ও সততা দিয়ে নিজের দৃষ্টিহীনতাকে জয় করে অনন্য নজির গড়েছেন।

যথারীতি বিশ্বভ্রমণের অংশ হিসেবে থাকছে আকর্ষণীয় বিদেশি প্রতিবেদনও। এবারের পর্বে দর্শকদের ক্যামেরার চোখে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হবে সুদূর অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের নান্দনিক রাজধানী মেলবোর্নে। দেখানো হবে সেখানকার বিখ্যাত ফিলিপ আইল্যান্ডের (Phillip Island) সমুদ্র সৈকতে লাখো খুদে পেঙ্গুইনদের চমত্কার সান্ধ্যকালীন প্যারেড— যা ‘দ্য পেঙ্গুইন প্যারেড’ নামে বিশ্বখ্যাত।

নিয়মিত আয়োজনে থাকছে দর্শকপ্রিয় ‘কাশেম টিভি’র সেই চেনা রিপোর্টারের সঙ্গে তাঁর চটপটে নাতির জমজমাট ও বুদ্ধিদীপ্ত নতুন আড্ডা— যা দর্শকদের হাসানোর পাশাপাশি সমসাময়িক নানা বিষয়ে গভীর চিন্তার খোরাক জোগাবে। এ ছাড়াও ইত্যাদির নিয়মিত অত্যন্ত জনপ্রিয় আয়োজনের মধ্যে রয়েছে চিঠিপত্র পর্ব এবং দেশের চলমান বেশকিছু সামাজিক অসংগতি, প্রশাসনিক অনিয়ম ও সমসাময়িক প্রসঙ্গনির্ভর তীক্ষ্ম, ধারালো ও তীর্যক ব্যঙ্গাত্মক নাট্যাংশ। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— বাজারে খুচরা টাকার ভাঙতি সংকট, ফাঁকা আওয়াজ বা শো-অফ করার মানসিকতা, আধুনিক ভ্যান অ্যাম্বাসেডরদের দৌরাত্ম্য, ফেসবুকের বড় ভাই-ছোট ভাই তর্ক, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্টের কারণ, দুর্নীতি-ভীতি ও যুবসমাজের অতিমাত্রায় চাকরিপ্রীতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধ্বংসের কুফল, পথভ্রষ্ট আধুনিক মানুষ, আমজনতার আচরণ এবং চাঁদের কলঙ্ক নিয়ে প্রান্তিক কৃষকদের সহজ-সরল চিন্তাসহ বেশ কয়েকটি সমসাময়িক হাসির ও শিক্ষণীয় নাটিকা।

এবারের ইত্যাদি’র বিভিন্ন নাট্যাংশে অংশগ্রহণকারী দেশের উল্লেখযোগ্য প্রথম সারির শিল্পীরা হলেন— সোলায়মান খোকা, মীর নাসিমুল ইসলাম সেলিম, প্রবীণ অভিনেতা আব্দুল আজিজ, বড়দা মিঠু, সুভাশিষ ভৌমিক, আনোয়ার শাহী, সুমন পাটোয়ারী, আমিন আজাদ, শাহেদ আলী, আনন্দ খালেদ, সাজ্জাদ সাজু, সাদিয়া তানজিন, সূচনা শিকদার, রকি খান, মুকুল সিরাজ, হানিফ পালোয়ান, জাহিদ শিকদার, কামাল বায়েজিদ, জিল্লুর রহমান, আশরাফুল আলম সোহাগ, সাইদুর রহমান পাভেল, সাবরিনা নিসা, সুজাত শিমুল, সুবর্ণা মজুমদার, জামিল হোসেন, বিলু বড়ুয়া, তারিক স্বপন, আনোয়ারুল আলম সজল, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান আবু হেনা রনি, এমএনইউ রাজু, ইকবাল হোসেন, মিরাজ, নিপু, নজরুল ইসলাম, নূরে আলম নয়ন ও বেলাল আহমেদ মুরাদসহ প্রবীণ ও নবীন আরও অনেকে।

বরাবরের মতো এবারও ইত্যাদির রাজকীয় মেগা সেট ও শিল্প নির্দেশনায় এবং মঞ্চ পরিকল্পনায় ছিলেন খ্যাতিমান শিল্প নির্দেশক মুকিমুল আনোয়ার মুকিম। প্রধান পরিচালকের দক্ষ সহকারী হিসেবে পুরো আয়োজনে নেপথ্যে কাজ করেছেন রানা সরকার ও মোহাম্মদ মামুন।

আগামী শুক্রবার (৫ জুন) রাত ৮টার বিটিভির প্রধান বাংলা সংবাদের পর একযোগে বাংলাদেশ টেলিভিশন (BTV) ও বিটিভি ওয়ার্ল্ডে একযোগে প্রচার হবে ইত্যাদির এই বহুল প্রতীক্ষিত ধামাকা নরসিংদী পর্ব। অনুষ্ঠানটি যথারীতি রচনা, পরিচালনা ও সাবলীল উপস্থাপনা করেছেন সবার প্রিয় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত। এটি যৌথভাবে নির্মাণ করেছে ফাগুন অডিও ভিশন (Fagun Audio Vision) এবং এর মূল স্পন্সরে রয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন