এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের ৩ গবেষক

প্রকাশ: সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ০৫:২৫ অপরাহ্ণ
এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের ৩ গবেষক
বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক : বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের নাম আবারও অত্যন্ত গৌরবের সাথে উজ্জ্বল করলেন দেশের তিন কৃতি গবেষক ও বিজ্ঞানী। সিঙ্গাপুরভিত্তিক আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী বিজ্ঞান সাময়িকী ‘এশিয়ান সায়েন্টিস্ট’ (Asian Scientist) প্রকাশিত এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় এবার সগৌরবে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের তিন জন প্রথিতযশা ও মেধাবী গবেষক। তালিকায় স্থান পাওয়া এই বাংলাদেশি কীর্তিমানরা হলেন তরুণ বিজ্ঞানী মারজানা আক্তার, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (icddr,b) নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (BUTEX) সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন শায়ক।

গত শনিবার (৩০ মে) সন্ধ্যা ৭টা ২৬ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি’ এবং ‘বৈশ্বিক গবেষণা’ বিভাগের এক বিশেষ বিশেষাদৃত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই তিন বিজ্ঞানীর বিশ্বমঞ্চ জয়ের বিবরণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

সাময়িকীটির অফিশিয়াল বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই তিন বিজ্ঞানীর নিজস্ব মৌলিক গবেষণা মূলত যথাক্রমে আধুনিক কৃষি (ভাইরোলজি), বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশবান্ধব সবুজ শিল্প প্রযুক্তি (Green Technology) খাতে বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এই মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক তালিকায় আমাদের দেশীয় বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী শিমন সাকাগুচি, রসায়নে নোবেলজয়ী সুসুমু কিতাগাওয়া এবং গণিতের নোবেল হিসেবে খ্যাত বিশ্বখ্যাত ‘আবেল পুরস্কার’ বিজয়ী মাসাকি কাশিওয়ারার মতো বিশ্বনন্দিত ক্ষণজন্মা বিজ্ঞানীরাও স্থান পেয়েছেন। মূলত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, মানবকল্যাণে গবেষণার সুনির্দিষ্ট অবদান, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন এবং একাডেমিয়া কিংবা শিল্প উৎপাদন খাতে যুগান্তকারী নেতৃত্বের স্বীকৃতির কঠোর মাপকাঠির ওপর ভিত্তি করেই প্রতি বছর এই তালিকা তৈরি করা হয়। এবার নির্বাচিত এই বিজ্ঞানীদের ‘এশিয়ান সায়েন্টিস্ট ১০০ অনারি’ (Asian Scientist 100 Honoree) হিসেবে আন্তর্জাতিক স্তরে সম্মানিত করা হয়েছে।

এবারের তালিকায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের মধ্যে আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া স্তরে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছেন তরুণ জিনবিজ্ঞানী মারজানা আক্তার। তিনি শুধু এশিয়ার সেরা ১০০ জনের তালিকায় স্থানই পাননি, বরং চলতি বছরের নির্বাচিত বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীদের মধ্যে সামগ্রিকভাবে ‘সবচেয়ে কম বয়সী গবেষক’ (Youngest Scientist) হিসেবে অনন্য এক বিশ্ব স্বীকৃতি লাভ করেছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (BAU) সাবেক এই প্রতিভাবান শিক্ষার্থী দেশের পোলট্রি শিল্পে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী একটি সম্পূর্ণ নতুন বিশেষ ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স ও তার গতিপ্রকৃতি প্রথমবারের মতো নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে এশীয় অঞ্চলের ভাইরোলজি গবেষণায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন।

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিজ্ঞান মঞ্চেও নিজের অবস্থান ইতিমধ্যেই শক্ত করেছেন মারজানা। বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মধ্যে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে নির্বাচিত মাত্র ১০ জন প্রভাবশালী তরুণীর একজন হিসেবে তিনি গত ২০২৫ সালে জাতিসংঘের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘ইয়াং উইমেন ফর বায়োসিকিউরিটি ফেলোশিপ’ (Young Women for Biosecurity Fellowship) লাভ করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বায়োসিকিউরিটি, বায়োসেফটি এবং সায়েন্স ডিপ্লোম্যাসি নিয়ে বিশ্বমঞ্চে কাজ করছেন।

তবে মারজানার এই মহাজাগতিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক কঠিন ও অশ্রুসজল সংগ্রামের অবিশ্বাস্য গল্প। তাঁর স্বামী এবং নিউজিল্যান্ডভিত্তিক বিশ্বখ্যাত ওয়্যারলেস পাওয়ার ট্রান্সফার কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইউশা আরাফ গণমাধ্যমকে জানান, মাস্টার্স অধ্যয়নের সময় চূড়ান্ত ল্যাব ও গবেষণার কাজ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চালিয়ে যেতে গিয়ে মারজানা গর্ভাবস্থায় এক গুরুতর ও জটিল শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হন। এক পর্যায়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তাঁকে হাসপাতালের আইসিইউতেও (ICU) লাইফ সাপোর্টে ভর্তি থাকতে হয়েছিল। তবে অদম্য এই নারী দমে যাননি; ফুটফুটে সন্তান জন্ম দেওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় তীব্র শারীরিক কষ্ট উপেক্ষা করে তিনি অত্যন্ত সফলভাবে নিজের মাস্টার্স থিসিস ডিফেন্ড করেন এবং আন্তর্জাতিক ট্র্যাকে জয়ী হন।


তালিকায় স্থান পাওয়া দ্বিতীয় বাংলাদেশি গবেষক ড. তাহমিদ আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য ও অপুষ্টি খাতে একজন কিংবদন্তি হিসেবে কাজ করে আসছেন। বর্তমানে আইসিইউ বা আইসিডিডিআর,বির প্রথম বাংলাদেশি নির্বাহী পরিচালক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করা বিশ্বখ্যাত এই চিকিৎসা বিজ্ঞানী বিশেষ করে মা ও শিশুর চরম পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ, এশীয় অঞ্চলে শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং স্বল্পমূল্যে ডায়রিয়া প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি যুগান্তকারী ক্লিনিকাল ট্রায়াল ও গবেষণা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চিকিৎসা গবেষণাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পে পরিবেশবান্ধব বৈপ্লবিক প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বমানের গবেষণার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন বুটেক্সের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন শায়ক। টেক্সটাইল ডাইং ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ (Carbon Emission) উল্লেখযোগ্য হারে কমানো, আন্তর্জাতিক মানের টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শতভাগ কেমিক্যালমুক্ত পরিবেশবান্ধব সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবনই তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র। জানা গেছে, তাঁরই একক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম ‘ডিকার্বোনাইজেশন ল্যাব’ (Decarbonization Lab)-এ কম ক্ষতিকর প্রাকৃতিক রাসায়নিক ব্যবহার করে সুতা ও কাপড়ে স্থায়ী রং করার সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব মেলবন্ধন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে, যা দেশের রপ্তানি খাতে এক বিশাল বিপ্লব আনতে যাচ্ছে। দেশের এই তিন সূর্যসন্তানের এমন বিশ্বজয়ে বাংলাদেশের বিজ্ঞান মহলসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে আনন্দের জোয়ার বইছে।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন