প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে অংশ নিচ্ছে না জমিয়ত
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিগত আন্দোলন ও যুগপৎ সংগ্রামে থাকা মিত্র রাজনৈতিক দল এবং জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক বিশেষ সৌজন্য বৈঠক ও নৈশভোজের আয়োজন করেছেন নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ সোমবার (২০ জুলাই) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন তথা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’য় এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
চলতি মেয়াদে সরকার গঠনের পর যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের সঙ্গে এটিই হতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত এই রাজনৈতিক বৈঠকে অংশ না নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির অন্যতম পুরনো ও শীর্ষ ধর্মীয় মিত্র দল ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ’।
আজ সোমবার দুপুরে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বৈঠক বর্জনের এই বিষয়টি একটি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব মাওলানা মঞ্জরুল ইসলাম আফেন্দী।
তিনি বলেন, ‘যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম শরিক দল হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আমরা আজ রাতের বৈঠকের আনুষ্ঠানিক দাওয়াত বা আমন্ত্রণপত্র পেয়েছি। তবে দলের উচ্চপর্যায়ের দলীয় ও রাজনৈতিক যৌথ সিদ্ধান্তের কারণে আমরা আজকের এই যমুনার বৈঠকে সশরীরে অংশ নিচ্ছি না।’ তবে ঠিক কী বিশেষ বা গুরুতর কারণে দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপি’র এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি জমিয়ত বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে পুরোপুরি অস্বীকৃতি জানান মাওলানা মঞ্জরুল ইসলাম আফেন্দী।
দলীয় ও রাজনৈতিক একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে সম্মানজনক ৪টি সংসদীয় আসনে সরাসরি ছাড় দিয়েছিল বিএনপি। তবে রাজনৈতিক সমীকরণের মারপ্যাঁচে এসব আসনের একটিতেও তারা চূড়ান্ত বিজয় লাভ করতে পারেনি। নতুন প্রেক্ষাপটে সরকার গঠনের পর থেকে বড় শরিক দল বিএনপি তাদের আগের মতো মূল্যায়ন, খতিয়ান বা রাজনৈতিক গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে জমিয়তের তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অভিযোগের সৃষ্টি হয়েছে।
জমিয়ত নেতাদের মূল অভিযোগ, জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে সরকার গঠন পর্যন্ত দীর্ঘ এই সময়ে বিএনপির শীর্ষ বা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের পক্ষ থেকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কোনো ধরণের রাজনৈতিক বা আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ রক্ষা করা হয়নি।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জমিয়তের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক বিএনপির বিরুদ্ধে নিজের প্রকাশ্য ক্ষোভ ও অসন্তোষ উগড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ সময় পার হলেও বিএনপির পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে কোনো ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ রাখা হয়নি। এমনকি সৌজন্যমূলক সাধারণ কুশল বিনিময় বা একটি আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করার প্রয়োজনও মনে করেনি তারা।’ তিনি ক্ষোভের সাথে অভিযোগ করেন, যুগপৎ আন্দোলনের অন্যান্য ছোট-বড় শরিকদের সরকার ও দলের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও, ইসলামী মূল্যবোধের ধারক দল জমিয়তকে ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে উপেক্ষা ও অবমূল্যায়ন করা হয়েছে।
দলীয় খতিয়ান থেকে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে ৪টি ভিআইপি আসন ছেড়েছিল তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আসনগুলো হলো— নীলফামারী-১, নারায়ণগঞ্জ-৪, সিলেট-৫ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২।
এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিলেট-৫ (কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ) আসনে জমিয়তের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক নিজে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ) আসনে দলের প্রভাবশালী সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব, নীলফামারী-১ (ডিমলা ও ডোমার) আসনে দলটির মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে দলটির জেলা সভাপতি মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী ধানের শীষের মোড়কে বা জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। কিন্তু ভোটের মাঠে বিএনপির পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও এই চার হেভিওয়েট প্রার্থীর কেউই শেষ পর্যন্ত জয়ের মুখ দেখতে পারেননি।
এদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নীতি নির্ধারণী সূত্রগুলো বলছে, বিগত রাজপথের কঠিন যুগপৎ আন্দোলনে দীর্ঘ সময় পাশে থাকা মিত্র দল ও জোটের সকল প্রতিনিধিদের সঙ্গে মূলত আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মতবিনিময় করতে আজ রাতে তাঁদের যমুনায় ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছোট-বড় সব শরিক দলকেই অত্যন্ত মর্যাদার সাথে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এমনকি নির্বাচনের ঠিক আগে যেসব ছোট দল নিজেদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে সরাসরি বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছেন, সেইসব নেতাদেরও আজকের এই মিলনমেলায় সম্মানের সাথে ডাকা হয়েছে।
বিএনপির শীর্ষ এক নেতার মতে, দীর্ঘ আন্দোলনের পর রাষ্ট্র গঠনের এই সন্ধিক্ষণে পরস্পরের সঙ্গে রাজনৈতিক ও মানসিক হৃদ্যতা বাড়ানোটাই প্রধানমন্ত্রীর এই ডিনার বা ডেস্কেট অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। রাষ্ট্র ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে সবার মূল্যবান মতামত ও সুনির্দিষ্ট পরামর্শের ভিত্তিতে কীভাবে আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় এবং ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগোনো যায়, মূলত সে ব্যাপারেই দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত শরিকদের সঙ্গে খোলামেলা, আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
|