অবসরে যাওয়ার ভাবনা নাকচ করলেন শেখ হাসিনা

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০১:০৩ অপরাহ্ণ
অবসরে যাওয়ার ভাবনা নাকচ করলেন শেখ হাসিনা

নিজস্ব প্রতিবেদক:ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর, একটা সময়ে রাজনীতি থেকে চিরতরে অবসরে যাওয়ার কথা ভাবলেও—বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণ সরে এসেছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। দেশের বর্তমান অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে তিনি নিজের সিদ্ধান্ত বদলে এখন দেশের মানুষের পাশে থাকার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছেন। ভারতের নতুন দিল্লি থেকে ওপার বাংলার একটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া দীর্ঘ ও অত্যন্ত খোলামেলা এক একান্ত সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা তাঁর ক্ষমতা হস্তান্তর না করা, ইস্তফা বিতর্ক, দলীয় পুনর্গঠন এবং দেশে ফেরার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে সবিস্তার কথা বলেছেন। আজ মঙ্গলবার সেই সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) সকাল ১১টা ৫৪ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘জাতীয় রাজনীতি, নির্বাচন ও দলীয় কূটনীতি’ এবং ‘দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতি, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা ট্র্যাকিং উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সাক্ষাৎকারের মূল বক্তব্য বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে সবসময় মানুষের দুঃসময়ে তাদের পাশে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। ১৯৮১ সালে আমি যখন মা-বাবা, ভাইসহ সব হারিয়ে স্বদেশে ফিরেছিলাম, তখন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কর্মীরাই ছিলেন আমার একমাত্র পরিবার। আজ সেই নেতা-কর্মীরা দেশজুড়ে নির্যাতিত, কারাগারে বন্দি ও অনেকে ঘরছাড়া। দেশের জনগণের জীবন আজ বিপর্যস্ত। এমন একটা সময়ে আমি কীভাবে স্বার্থপরের মতো তাদের এই অবস্থায় ফেলে রেখে বিশ্রামে চলে যাই?

এর আগে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দেওয়া বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন যে তাঁর মা রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান। জয়ের সেই বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি লিখিত উত্তরে জানান, জয়ের বক্তব্যটি মূলত আমার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ক্লান্তিবোধ ও অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত ছিল। মানুষ আজীবন একই দায়িত্বে থাকে না, নতুন নেতৃত্ব আসা উচিত—তা আমি দলের বিগত দুই কাউন্সেলেও বলেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমার আর নতুন করে কিছুই পাওয়ার নেই। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, দেশে গণতন্ত্র আক্রান্ত, সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে। তাই জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি এখনই অবসরে যাচ্ছেন না।

আওয়ামী লীগের পদাধিকারী পরিবর্তন ও প্রবীণদের সরিয়ে তরুণদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে শেখ হাসিনা একটি চমৎকার ব্যাখ্যা দেন। তিনি একটি গণমাধ্যমকে বলেন, দলীয় পুনর্গঠন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমরা এই মুহূর্তে একটা প্রাকৃতিক শুদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যারা সত্যিকারের আদর্শের জন্য এই দলে ছিলেন, তারা আজকের এই ঘোর দুর্দিনেতেও দলের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আর যারা কেবল ব্যক্তিগত সুবিধা ও ক্ষমতার লোভে এসেছিলেন, তারা ইতিমধ্যেই ভোল পাল্টে ফেলেছেন অথবা ভয়ে চুপ করে গিয়েছেন। এই দুঃসময় দলকে দুর্বল করেনি, বরং খাঁটি ও শক্তিশালী করেছে। তিনি স্পষ্ট করেন, নেতৃত্ব কোনো অলঙ্কার নয়, এটি পবিত্র দায়িত্ব; তাই যারা কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে পারবেন না, তাদের বিষয়ে দলীয় ফোরামেই সিদ্ধান্ত হবে। তবে প্রবীণদের অবদান ও অভিজ্ঞতাকে দলের সম্পদ হিসেবে মূল্যািয়ন করা হবে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অডিও বার্তায় খুব দ্রুত বাংলাদেশে ফেরার যে ঘোষণা তিনি দিয়েছিলেন, বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তা কতটা বাস্তবসম্মত—এমন প্রশ্নের জবাবে মুজিব-কন্যা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, অতীতের পাকিস্তানি শাসকরা পারেনি, সামরিক শাসকেরা পারেনি, কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরাও পারেনি এবং আজকের বিএনপি সরকারও আওয়ামী লীগকে চিরতরে মুছে ফেলতে পারবে না। আমার প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের হৃত গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ের সাথে সরাসরি যুক্ত। দেশের সাধারণ মানুষ আজ বুঝতে পেরেছেন যে আওয়ামী লীগই তাদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। আমি জনগণের সেই শক্তিতে বলীয়ান হয়েই খুব দ্রুত মাথা উঁচু করে স্বদেশের মাটিতে ফিরব। আগামীতে নতুন কাউন্সিলের মাধ্যমে দেশপ্রেমিক তরুণদের হাতে দলের পতাকা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনাও ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে তিনি সাক্ষাৎকারে দাবি করেন।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন