দায়িত্ব নিয়েই নেপালে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করলেন নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী

প্রথম দিনেই ১০০ দফার যুগান্তকারী সংস্কার পরিকল্পনা অনুমোদন; ১৯৯১ সাল থেকে সব নেতার সম্পদের হিসাব তলব, কমছে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা

দায়িত্ব নিয়েই নেপালে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করলেন নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপালের নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির নেতা বালেন্দ্র (বালেন) শাহ দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। রবিবার (২৯ মার্চ) অনুষ্ঠিত প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই তিনি রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে একটি উচ্চাভিলাষী ১০০ দফার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন। কাঠমান্ডু পোস্ট ও ফার্স্ট পোস্টের বরাত দিয়ে জানা যায়, নেপালের রাষ্ট্রযন্ত্রকে দুর্নীতিমুক্ত, আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে এই বিশাল পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বালেন্দ্র শাহের সরকার, যার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে শিক্ষাক্ষেত্র ও প্রশাসন সংস্কার।

ক্যাম্পাস থেকে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির বিদায় নেপালের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্যে সরাসরি আঘাত হেনে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ঘোষণা করেছেন, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো থেকে সব ধরনের রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ করা হবে। এগুলোর পরিবর্তে গঠন করা হবে সম্পূর্ণ নির্দলীয় ‘স্টুডেন্ট কাউন্সিল’। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া বা দলীয় আনুগত্য প্রকাশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জনসেবা খাতে বিদ্যমান দলীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোও বিলুপ্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার হয়ে ওঠে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে নতুন সরকার ঘোষণা করেছে, একটি বিশেষ কমিটি ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সব রাজনীতিক এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আর্থিক সম্পদের উৎস তদন্ত করবে। সন্দেহজনক লেনদেন ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রিয়েল-টাইমে নজরদারি করতে একটি ডিজিটাল রেজিস্ট্রি তৈরি করা হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি ফাঁসকারী তথ্যদাতাদের (হুইসেলব্লোয়ার) সুরক্ষায় বিশেষ আইনি কাঠামো তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রশাসনে শুদ্ধি ও ডিজিটাল রূপান্তর প্রশাসনের ব্যয় কমাতে এবং কর্মদক্ষতা বাড়াতে বর্তমানে বিদ্যমান ফেডারেল মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে কমিয়ে ১৭-তে নামিয়ে আনা হবে। অকেজো বোর্ড ও কমিটিগুলো বিলুপ্ত বা একীভূত করা হবে এবং প্রতিটি পদে নির্দিষ্ট ‘কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর’ (কেপিআই) নির্ধারণ করা হবে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় সেবা আধুনিকীকরণে এখন থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রই (এনআইডি) হবে সব সরকারি সেবা পাওয়ার প্রধান মাধ্যম। পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং নাগরিকত্ব সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো ‘ফেসলেস’ বা সরাসরি সাক্ষাৎহীন ডিজিটাল পদ্ধতিতে দেওয়া হবে, যাতে দুর্নীতির কোনো সুযোগ না থাকে। এছাড়া অর্থনীতিকে গতিশীল করতে মাত্র দুই দিনের মধ্যে স্টার্টআপ নিবন্ধন এবং বড় বিনিয়োগের জন্য ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক পটভূমি গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং প্রথাগত বড় দলগুলোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের কারণে নেপালের রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্মের উত্থান ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় কাঠমান্ডুর জনপ্রিয় মেয়র বালেন্দ্র শাহ দেশব্যাপী ‘সুশাসনের’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলেন। চলতি বছরের (২০২৬) ফেব্রুয়ারি-মার্চের নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশটির রাজনীতিতে কয়েক দশকের ‘পুরোনো জমানা’র অবসান ঘটিয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন তিনি।

এম.এম/সকালবেলা

মন্তব্য করুন