মাদক বিক্রির অভিযোগে সালিস বৈঠকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন

প্রকাশ: শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:৪৬ অপরাহ্ণ
মাদক বিক্রির অভিযোগে সালিস বৈঠকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন

সংগৃহীত ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে মাদক ব্যবসা করার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে সালিস বৈঠকে হাত-পা বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার কাইতলা উত্তর ইউনিয়নের নারুই বাজারে এই নির্মম ঘটনাটি ঘটে।

নির্যাতনের শিকার ওই ব্যক্তির নাম হবি মিয়া (৪০)। তিনি নারুই গ্রামের মৃত রহমতের ছেলে। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে এলাকায় তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নারুই গ্রামের মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুপুরে নারুই বাজারে একটি সালিস বৈঠকের আয়োজন করে এলাকার ‘মাদক নির্মূল কমিটি’। সেই বৈঠকে মাদক ব্যবসা করার অভিযোগ এনে হবি মিয়াকে হাজির করা হয় এবং তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। সবচেয়ে নির্মম বিষয় হলো, হবির বৃদ্ধা মা এবং তাঁর স্ত্রীর সামনেই চলে এই নির্যাতন।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, স্থানীয় সর্দারদের নির্দেশে হবি মিয়ার হাত-পা শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। এরপর তাঁর পায়ের তালুতে লাঠি দিয়ে একের পর এক সজোরে আঘাত করা হচ্ছে। যন্ত্রণায় ও ব্যথায় ওই ব্যক্তি তীব্র চিৎকার করলেও সেখানে উপস্থিত শতাধিক মানুষ চেয়ারে বসে ও দাঁড়িয়ে তা দেখছিলেন। এমনকি অনেককে মুঠোফোনে এই জঘন্য দৃশ্য রেকর্ড করতেও দেখা যায়।

ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও নেটিজেনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সাংবাদিক রুহুল আমিন রিপন ভিডিওটি শেয়ার করে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, বড় নেতারা মাদক নিয়ন্ত্রণ করে এবং পুলিশ মাসোহারা নেয়। আদালত থেকে আসামিরা ছাড়া পেয়ে যায় উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, মাদক থেকে বাঁচার উপায় কী? রাষ্ট্র ব্যর্থ বলেই এমন পরিস্থিতি বাড়ছে।

অন্যদিকে ওবায়দুর রহমান বাদল নামের স্থানীয় এক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এই নির্যাতনের সাধুবাদ জানিয়ে মন্তব্য করেছেন, পুলিশ ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করলে এভাবেই মাদক দূর করতে হবে। তবে এই জঘন্য দৃশ্যের তীব্র বিরোধিতা করে মানিক হায়দার নামের একজন লিখেছেন, কেউ অপরাধী হলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়। তিনি এই কথিত সর্দারদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।

এই বিষয়ে নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোর্শেদ আলম চৌধুরী জানান, ফেসবুকের মাধ্যমে ঘটনাটি জানার পরপরই সেখানে একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে (এসআই) পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে ভিক্টিমকে উদ্ধার করাসহ নির্যাতনকারীদের ধরে নিয়ে আসতে পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ ফিরে আসার পরপরই প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওসি স্পষ্ট করে বলেন, “কেউ নির্দয়ভাবে মাদক বিক্রেতাসহ কোনো ব্যক্তিকেই প্রকাশ্যে এভাবে হাত-পা বেঁধে পেটানোর মতো জঘন্য কাজ করতে পারে না।”

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নবীনগর সার্কেল) পিয়াস বসাক বলেন, “পুলিশকে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইতিমধ্যেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।”

মন্তব্য করুন