জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশ: শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:৫৫ অপরাহ্ণ
জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

জাতীয় ডেস্ক : বর্তমান বিশ্বের সামনে সবচেয়ে বড় এবং অনস্বীকার্য এক প্রাকৃতিক সংকট ও চ্যালেঞ্জের নাম জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও পরিবেশ দূষণের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তীব্র তাপদাহ, অনিয়মিত ও অসময়ের বৃষ্টিপাত, উপর্যুপরি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং আশঙ্কাজনকভাবে জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় আজ মানবজাতির অস্তিত্বকে সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ ও দূরদর্শী বাণীতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান এই অভিঘাতকে বিশ্ববাসীর জন্য এক ‘কঠিন বাস্তবতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে আগামী ৫ বছরে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এক ঐতিহাসিক মেগা কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন সরকারপ্রধান।

আজ শুক্রবার (৫ জুন) দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে পরিমার্জিত ও হালনাগাদকৃত ‘জাতীয় ও পরিবেশ’ এবং ‘বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, টেকসই বনায়ন ও সবুজ শিল্পায়ন উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাণীর মূল বিষয়বস্তু এবং সরকারের পরিবেশবান্ধব মহাপরিকল্পনা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাতে দেওয়া এক বিশেষ বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “পরিবেশ ও জলবায়ু সংকটের তীব্র প্রভাব আজ বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর অত্যন্ত গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং নতুন প্রজন্মের জন্য টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও কার্যকর সবুজ উদ্যোগ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।”

প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস (Greenhouse Gas) নিঃসরণে বাংলাদেশের সামগ্রিক অবদান ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সামান্য ও নগণ্য হলেও, অনন্য ভৌগোলিক অবস্থান, অতি উচ্চ জনঘনত্ব এবং জলবায়ু-সংবেদনশীল ভঙ্গুর অর্থনীতির কারণে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি আজ বিশ্বের অন্যতম প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সদ্য প্রকাশিত ‘জলবায়ু ঝুঁকি সূচক-২০২৬’ (Climate Risk Index 2026) অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনও বৈশ্বিকভাবে উচ্চ পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, হ্রাস পাচ্ছে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন, দেখা দিচ্ছে তীব্র জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা বৃদ্ধির ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।

জলবায়ুর এই ভয়াবহ ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের গৃহীত নানাবিধ সময়োপযোগী ও দূরদর্শী উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানান, দেশের পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP) এবং জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (NDC) বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক নীতি কাঠামো অনুসরণ করছে। যার মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদারকরণ, গ্রামীণ ও সামাজিক বনায়ন বৃদ্ধি, আধুনিক দুর্যোগ প্রস্তুতি, জলবায়ুজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর টেকসই পুনর্বাসন এবং প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানকে (Nature-based solutions) সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী এক অবিস্মরণীয় ঘোষণা দিয়ে বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশব্যাপী সর্বস্তরের জনগণকে সাথে নিয়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এক বিশাল ও যুগান্তকারী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। এই বনায়ন কর্মসূচির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়সমূহের নাব্য ফিরিয়ে আনা, জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে নিরসন, ভূগর্ভস্থ ও উপরিভাগের পানি সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দেশব্যাপী মোট ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রমের এক বিশাল যজ্ঞ ইতিমধ্যে শুরু করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে দেশের লাইফলাইন তথা কৃষিখাতের আধুনিকায়নের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সরাসরি রুখতে আমাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষিকে আরও বেশি টেকসই, আধুনিক, প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানসমৃদ্ধ এবং জলবায়ু-সহিষ্ণু (Climate-resilient) ভিত্তির ওপর পুনর্গঠন করা এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে কৃষি গবেষণাগার, নতুন জাতের উদ্ভাবন, মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ ও কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।”

একই সাথে তিনি দেশের জ্বালানি খাতে আমূল পরিবর্তন এনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির (Renewable Energy) ব্যবহার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব সবুজ শিল্পায়ন (Green Industrialization), টেকসই নগরায়ণ, আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (Waste Management), পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কার্বন নিঃসরণকারী প্রযুক্তির বদলে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক কার্বন ক্রেডিট এবং বৈশ্বিক কার্বন মার্কেটের (Global Carbon Market) বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীর শেষাংশে দৃঢ়তার সাথে বলেন, “সকলের সমন্বিত উদ্যোগ, সর্বস্তরের মানুষের মাঝে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাত্যহিক জীবনে দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই কেবল একটি চিরসবুজ, নিরাপদ, শতভাগ বাসযোগ্য ও জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।” এই জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে তিনি সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সাধারণ জনগণকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানান।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দেশজুড়ে গৃহীত সকল সরকারি ও বেসরকারি কর্মসূচির সার্বিক ও বর্ণাঢ্য সাফল্য কামনা করে প্রধানমন্ত্রী দেশের পরিবেশের সুরক্ষায় প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আরও বেশি সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন