ইসলামী জীবন ডেস্ক : আধুনিক সভ্যতার চরম উৎকর্ষতার যুগে আমরা প্রতিনিয়ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও জিপিএ-৫ পাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়তে দেখছি। কিন্তু একই সমান্তরালে সমাজ থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা ও পারিবারিক দায়িত্ববোধের মতো মৌলিক মানবিক গুণাবলি। এই নৈতিক সংকটের এক চরম ও বাস্তব চিত্র দেখা গেছে দেশের বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা মিরপুরের এক আলোচিত ও হৃদয়বিদারক ঘটনায়, যেখানে সন্তানরা উচ্চশিক্ষিত ও সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও এক বৃদ্ধা মা-কে চরম অবহেলা ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। শিক্ষিত সমাজের এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও দ্বীনি শিক্ষার অভাব নিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করতে এক বিশেষ দিকনির্দেশনামূলক কলাম লিখেছেন দেশের জনপ্রিয় ও প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ।
আজ শুক্রবার (৫ জুন) রাত ১টা ৫ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ইসলামী জীবন’ ও ‘সামাজিক অবক্ষয় নিরূপণ, দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থা ও পারিবারিক অধিকার উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহর সেই আলোড়ন সৃষ্টিকারী কলামটির মূল বক্তব্য ও কোরআন-হাদিসের বিশ্লেষণ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
শায়খ আহমাদুল্লাহ তাঁর কলামের শুরুতেই এই মানবিক ও নৈতিকতার চরম সংকটের পেছনে বর্তমানের আধুনিক ও বস্তুবাদী শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রধানত দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা একজন শিক্ষার্থীকে যতটা বেশি ক্যারিয়ারমুখী, কর্পোরেট দাস ও বৈষয়িক ভোগবাদী হতে শেখায়, তার এক শতাংশও তাকে একজন ভালো ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ হতে শেখায় না। ফলে দ্বীন, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানুষ হওয়ার মূল শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে আমরা যতদিন শুধু বস্তুবাদ ও বৈষয়িক সফলতার অন্ধ ইঁদুর দৌড়ে শামিল থাকব, ততদিন মিরপুরের মতো এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও লজ্জাজনক ঘটনা আমাদের সমাজে নিয়মিত ঘটতেই থাকবে।”
এই অবক্ষয়ের পেছনে তিনি পিতা-মাতার অতিরিক্ত বৈষয়িক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলেন, “সন্তানদের এই অধঃপতনের জন্য পিতা-মাতারাও অনেকাংশে দায়ী। কারণ শৈশব থেকেই আমরা সন্তানদের অতিরিক্ত ক্যারিয়ারনির্ভর ও চরম আত্মকেন্দ্রিক রোবট হিসেবে গড়ে তুলি। অথচ মনে রাখা দরকার, সন্তানদের কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স ও বৈষয়িক সচ্ছলতা দিলেও, যদি ইসলামের মৌলিক দ্বীন ও নৈতিকতার শিক্ষা না দেওয়া হয়, তবে তারা কখনোই আপনার শেষ বয়সের অবলম্বন বা প্রকৃত মানুষ হবে না। তারা বিপুল সম্পদের মালিক হয়তো হবে, কিন্তু জীবনে কখনো প্রকৃত মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে পারবে না।”
কলামে প্রকৃত ধনী বা সচ্ছল মানুষের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি বিখ্যাত হাদিস স্মরণ করিয়ে দেন। নবীজি (সা.) বলেছেন, “সম্পদের বাহ্যিক প্রাচুর্যই মানুষের প্রকৃত সচ্ছলতা নয়; বরং প্রকৃত সচ্ছলতা হলো মানুষের অন্তরের সচ্ছলতা।” (সহিহ বুখারি)। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, যার অন্তর আল্লাহর ভয়ে সচ্ছল ও পবিত্র, দুনিয়াতে সেই মূলত সবচেয়ে বড় ধনী। কারও বাহ্যিক টাকা-পয়সা না থাকলেও যদি তার অন্তরে ঈমানী সচ্ছলতা থাকে, তবে সে যেকোনো পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে অনেক বেশি সুখী, পরোপকারী ও প্রশান্ত থাকবে।
ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী প্রতিটি মানুষকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল হতে নির্দেশ করা হয়েছে। কিয়ামতের কঠিন ময়দানে প্রত্যেক মানুষই তার অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে আল্লাহর কাছে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হবে। হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, “পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের দ্বীন শেখানোর ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন, ঠিক তেমনি সন্তানরা জিজ্ঞাসিত হবে পিতা-মাতার হক ও শেষ বয়সে তাদের সেবা করার ব্যাপারে। একইভাবে স্বামী তার স্ত্রীর অধিকার এবং স্ত্রী তার স্বামীর দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। যখন সমাজের প্রতিটি মানুষ নিজের এই ধর্মীয় দায়িত্ব ও আখেরাতের জবাবদিহিতা সম্পর্কে সচেতন হবে, তখনই মূলত একটি সুন্দর ও নিরাপদ পরিবার এবং সমাজ বিনির্মিত হবে।”
তিনি জোরালো ভাষায় বলেন, “শুধু উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট থাকলেই যদি মানুষ গড়া সম্ভব হতো, তাহলে শিক্ষিত সন্তানদের হাতে এভাবে বুড়ো বয়সে পিতা-মাতা অবহেলিত হতেন না, দেশের বৃদ্ধাশ্রমগুলো প্রবীণদের কান্নায় পূর্ণ হতো না এবং সমাজে এত ধর্ষণ, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয় দেখা যেত না। প্রকৃত শিক্ষা সেটাই, যা মানুষকে কেবল বৈষয়িক কর্মদক্ষতায় দক্ষ করে তোলে না, বরং তাকে মা-বাবার প্রতি দায়িত্বশীল ও পরোপকারী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। তাই সন্তানদের জিপিএ-৫ বা বড় অফিসার বানানোর আগে প্রকৃত মানুষ হওয়ার পাঠ দেওয়া প্রতিটি মা-বাবার জন্য এখন ফরয দায়িত্ব।”
কলামের শেষাংশে শায়খ আহমাদুল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা ফাতিরের ২৮ নম্বর আয়াতের একাংশ পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরেন, যেখানে মহান আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, “বান্দাদের মধ্যে কেবল প্রকৃত জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।” এই আয়াতের তাফসীর করে তিনি বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত জ্ঞানী তারা নন যারা বড় বড় ডিগ্রিধারী, বরং প্রকৃত জ্ঞানী তারাই যারা আল্লাহভীরু (তাকওয়াবান), সৎ ও বিনয়ী। আর যারা জীবন ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করে, তারা কখনো নিজের জন্মদাত্রী মাকে ফেলে দিতে পারে না এবং সব জায়গায় মানবিকতার পরিচয় দেয়।
একটি সুন্দর ও আদর্শ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য এই মুহূর্তে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষার সংমিশ্রণ ঘটানোর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা তখনই পূর্ণাঙ্গভাবে সফল হবে, যখন তা মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয় ও মানবিকতার আলো জ্বালাতে সক্ষম হবে। তাই আসুন, আমরা সবাই সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে নিজের সন্তানদের শিক্ষিত করার আগে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা করি।
জান্নাত সকালবেলা