আজ শুক্রবার (৫ জুন) দুপুর ১২টা ১ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘দেশ ও পরিবেশ’ এবং ‘উপকূলীয় জলবায়ু পর্যবেক্ষণ, প্রবাল প্রাচীর বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশগত উদ্বাস্তু পুনর্বাসন উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপের অস্তিত্ব সংকটের আদ্যোপান্ত বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দা এবং পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি (Sea Level Rise), অস্বাভাবিক জোয়ারের তীব্রতা এবং ঘনঘন শক্তিশালী প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে দ্বীপ দুটির চারপাশে ভাঙন এখন প্রতিমুহূর্তে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে সেন্টমার্টিন দ্বীপের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গত দশ বছরে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ ফুট পর্যন্ত মূল ভূখণ্ড সরাসরি সাগরের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর ফলে দ্বীপের সামগ্রিক মানচিত্র ও আয়তন যেমন দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে, তেমনি কমে যাচ্ছে চাষাবাদ ও বসবাসের উপযোগী অমূল্য জমির পরিমাণ।
সেন্টমার্টিন বিচের কোনাপাড়ার সাবেক বাসিন্দা হাফেজ উল্লাহ (৪৫) নিজের ঘরবাড়ি সাগরে হারিয়ে বর্তমানে টেকনাফ পৌরসভার পল্লান পাড়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “সাগরের সঙ্গে যুদ্ধ করে দ্বীপে টিকে থাকা এখন অসম্ভব। গত দশ বছরে জলবায়ু এতটাই বদলে গেছে যে, সাগর একটু উত্তাল হলেই জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ১০-১৫ ফুট বৃদ্ধি পেয়ে পুরো দ্বীপকে প্রায় তলিয়ে দেয়। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে সেন্টমার্টিন পুরোপুরি সাগরের বুকে তলিয়ে যাবে।” সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলামও এই আশঙ্কার সুর মিলিয়ে বলেন, চার পাশে দ্রুত টেকসই গাইড ওয়াল বা ব্লক বাঁধ না দিলে প্রবাল দ্বীপকে রক্ষা করা যাবে না।
টেকনাফ মূল শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সীমান্ত সড়কের পূর্ব পাশে নাফ নদের তীরে শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়া। সেখানে এখনো চরম ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন শতাধিক পরিবারের পাঁচ শতাধিক মানুষ। নদীর পাড়ে ঝুপড়ি ঘরে বসবাসকারী ৫৩ বছর বয়সী প্রবীণ নারী আলমাজ খাতুন আঞ্চলিক ভাষায় নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, “ধইজ্যা (সাগরের) জোয়ারের পানি অইলে ঘরত থাহিত ন পারি। পানি বাড়লে অন্য ঘরে যাই, আবার কমলে ফিরি। যাইবার জায়গা নাই, এককান থাহিবার জায়গা চাই।” তিনবার ঘর নদীগর্ভে হারিয়েও অভাবের কারণে অন্য কোথাও যাওয়ার সামর্থ্য নেই তাঁর।
একই গ্রামের বাসিন্দা শাহেনা আক্তার (৫০) নাফ নদের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলেন, “ওই যেখানে এখন নৌকা ভাসছে, সেখানেই একসময় আমাদের ঘরবাড়ি, জমিজমা ও গরু-ছাগলসহ ৩০০ পরিবারের একটি সচ্ছল পাড়া ছিল। ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে শুরু হওয়া ভাঙনে চারবার আমরা নিজেদের বসতি হারিয়েছি।” শাহপরীর দ্বীপের ইউপি সদস্য আবদুস সালাম বলেন, গত ১০ বছরে তাঁর এলাকায় ৫ হাজারের বেশি মানুষ বসতি হারিয়েছেন, যার বড় অংশই এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে বা ঝুঁকিপূর্ণ নদীর পাড়ে টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন। সরকারের উচিত দ্রুত এই বাস্তুচ্যুতদের তালিকা করে স্থায়ী পুনর্বাসন করা।
ভূমি ভাঙনের পাশাপাশি এই দুই দ্বীপে দেখা দিয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের আরেক মারাত্মক অভিশাপ—ভয়াবহ সুপেয় পানির সংকট। সরকারি প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (DPHE) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে গেছে। একই সাথে মিষ্টি পানির পকেটে সমুদ্রের নোনা পানি প্রবেশ করায় পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা স্বাভাবিক গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে প্রায় ৯ গুণ বেশি পাওয়া যাচ্ছে, যা থেকে অনেক সময় তীব্র দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছে।
টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এনামুল হক এই বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সুপেয় পানির সংকটের কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে এই অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি ব্যবহার করছে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এছাড়া গভীর নলকূপগুলোর পানিতে ক্ষতিকর আর্সেনিকের উচ্চ উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে, যা দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে মানুষের শরীরে আর্সেনিকোসিসসহ পরবর্তীতে ক্যান্সারের মতো মারাত্মক ও প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
কক্সবাজারের পরিবেশ বিষয়ক সামাজিক সংগঠন ‘ম্যাজিক ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রতিষ্ঠাতা জিমরান মো. সায়েক বলেন, “টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনের এই মানবিক বিপর্যয় কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি আন্তর্জাতিক ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’ বা ক্লাইমেট জাস্টিসের (Climate Justice) একটি বড় প্রশ্ন। ক্ষতিগ্রস্ত ও জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর জন্য সরকারের উচিত নিরাপদ স্থানে পরিকল্পিত পুনর্বাসন, বিকল্প জীবিকার সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন বা কেয়া বন সংরক্ষণ করা।”
এই প্রসঙ্গে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী জানান, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা এবং ঘরবাড়ি হারানো গৃহহীন মানুষদের চিহ্নিত করে দ্রুত সরকারি পুনর্বাসন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং উপকূলীয় ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে দ্রুত টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জান্নাত সকালবেলা