আমরা যুদ্ধ চাই না তবে প্রতিরোধে প্রস্তুত: আরাগচি

প্রকাশ: শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ০৪:১০ অপরাহ্ণ
আমরা যুদ্ধ চাই না তবে প্রতিরোধে প্রস্তুত: আরাগচি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রধান মিত্র ইসরায়েলের সাথে চলমান তীব্র সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার মাঝেই বিশ্ববাসীকে এক কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি (Abbas Araghchi)। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, তেহরান নিজে থেকে কখনো কোনো যুদ্ধ বা সংঘাতের সূচনা করতে চায় না। তবে ইরানের ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব কিংবা স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বহিঃশত্রুর আগ্রাসন বা আক্রমণ চাপিয়ে দেওয়া হলে, ইরান তার জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার্থে চূড়ান্ত ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তমূলক জবাব দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) লেবাননভিত্তিক প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘আল মায়াদিন’ (Al Mayadeen)-কে দেওয়া এক বিশেষ ও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন।

আজ শুক্রবার (৫ জুন) বিকেল ৪টায় অনলাইন সংস্করণে পরিমার্জিত ও হালনাগাদকৃত ‘আন্তর্জাতিক’ ও ‘মধ্যপ্রাচ্য ভূরাজনীতি, পারস্য উপসাগরীয় সামরিক কৌশল ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারের আদ্যোপান্ত এবং তেহরানের অভ্যন্তরীণ ও সামরিক পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্যসমূহ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

সাম্প্রতিক সময়ে পারস্য উপসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ সফলভাবে সফরের অভিজ্ঞতা ও কূটনৈতিক নির্যাস তুলে ধরে আব্বাস আরাগচি বলেন, “আমরা এই অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছি। ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বা বিমান হামলায় যদি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মুসলিম দেশে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি (US Military Bases) ব্যবহার করা হয়, তবে ইরান তার আত্মরক্ষার আন্তর্জাতিক অধিকার বলে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সরাসরি সেই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু করবে।” তাঁর ভাষায়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘নিরাপত্তা ছাতা’ (Security Umbrella) মূলত এই অঞ্চলের সুরক্ষার জন্য নয়, বরং এটি আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য আরও বেশি অনিরাপত্তা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

সাক্ষাৎকারে ইরানের সাম্প্রতিক যুদ্ধকালীন সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ভূখণ্ডে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলার সময় তিনি স্বয়ং তৎকালীন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন। সে সময় প্রচণ্ড বোমাবর্ষণের মধ্যেও তিনি নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়েই সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত ছিলেন।

আরাগচি এক গোপন তথ্য ফাঁস করে দাবি করেন, হামলার তীব্রতা দেখে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে তাৎক্ষণিকভাবে একটি সুরক্ষিত মাটির নিচের বাংকারে চলে যাওয়ার জরুরি পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা কঠোরভাবে সেই সামরিক পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আলী খামেনি নাকি স্পষ্ট ভাষায় কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত দেশের প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের জন্য পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি নিজেও কোনো নিরাপদ বাংকারে বা গোপন স্থানে আশ্রয় নেব না।” আরাগচি এই ঐতিহাসিক অবস্থানকে জনগণের প্রতি একজন মহান নেতার সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতা ও সাহসিকতার অনন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

ইরানের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব প্রসঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের বর্তমান ও নতুন সর্বোচ্চ নেতা সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনির (Sayyid Mojtaba Khamenei) যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অধীনে ইরানের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও সামরিক কমান্ড কাঠামো অত্যন্ত সুসংগঠিত ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় থেকে নিয়মিতভাবে রাষ্ট্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করছেন। নিরাপত্তার কৌশলগত কারণে বর্তমানে জনসাধারণের মাঝে তাঁর সরাসরি উপস্থিতি কিছুটা সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত রাখা হলেও, রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি নির্ধারণ ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি পর্দার আড়ালে থেকে অত্যন্ত সক্রিয় ও জোরালো ভূমিকা পালন করছেন বলেও নিশ্চিত করেন আরাগচি।

আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও সশস্ত্র প্রতিরোধ প্রসঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল বিরোধী ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বা এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স (Axis of Resistance)-এর প্রতি তেহরানের আদর্শিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন আগের মতোই অবিচল ও অব্যাহত থাকবে। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে কেবল গাজা নয়, বরং লেবাননসহ সব চলমান সংঘাতময় ফ্রন্টকে এর আওতাভুক্ত করতে হবে।

আরাগচি আরও বলেন, “ইরান কখনো লেবাননের অভ্যন্তরীণ স্বাধীন রাজনীতি বা সার্বভৌমত্বে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি এবং লেবাননকে সর্বদা একটি ভ্রাতৃপ্রতীম মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে দেখে। ইহুদিবাদী ইসরায়েল একের পর এক বিমান হামলা ও প্রতিরোধ আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের কাপুরুষোচিত হত্যার মাধ্যমে এই প্রতিরোধকে দুর্বল করার যে অপচেষ্টা চালিয়েছে, বাস্তবে তা ব্যর্থ হয়েছে এবং হিজবুল্লাহসহ অন্যান্য আন্দোলন এখন আরও শক্তিশালী ও সুসংহত হয়েছে।”

তিনি দাবি করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ তাদের পশ্চিমা মিত্ররা ইরানের অবিশ্বাস্য দ্রুত পাল্টা প্রতিরোধ সক্ষমতা ও ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তি দেখে চরমভাবে বিস্মিত ও হতভম্ব হয়েছেন। একই সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে গাজা ও লেবাননে সংঘটিত ইসরায়েলি নৃশংস যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও আন্তর্জাতিক আদালতে (ICJ) ইরানের আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জোরালো অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বক্তব্য শেষ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন