বিনোদন প্রতিবেদক : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রখ্যাত নির্মাতা তানিম নূরের নতুন ও বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রদর্শনী হঠাৎ স্থগিত বা বন্ধ করে দেওয়ার ন্যাক্কারজনক ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে। মুক্ত সংস্কৃতির ওপর এমন আঘাতের ঘটনায় এবার তীব্র ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করে নিজের স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সাবেক সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি সাফ জানিয়েছেন, কারও ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দ অন্যের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার এই উগ্র মানসিকতাকে কোনোভাবেই রাষ্ট্র বা সমাজের প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়।
আজ মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘বিনোদন’ ও ‘সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা’ বিভাগের এক বিশেষ প্রতিবেদনে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ফেসবুক প্রতিক্রিয়া এবং দেশের চলচ্চিত্র খাতের প্রশাসনিক কাঠামোগত সংস্কারের দাবি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
আজ মঙ্গলবার বেলা ২টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক (Facebook) অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ ও তথ্যবহুল স্ট্যাটাসে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী উল্লেখ করেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি তিনি কিছুটা দেরিতে জানতে পেরেছেন। তবে ঘটনাটি জানার পর থেকেই একজন সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ।
নিজের স্ট্যাটাসে উগ্র মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করে ফারুকী লেখেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা অনেক দেরিতে জানলাম। যাই হোক, এটা একটা ফ্রিন্জ ইলেমেন্ট (প্রান্তিক বা উগ্র গোষ্ঠী) হইলেও এসব মানসিকতাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া উচিত না। আমাদের স্পষ্ট মনে রাখতে হবে, কারো কাছে সিনেমা যদি ধর্মীয় দৃষ্টিতে ‘হারাম’ মনে হয়, তবে সে সিনেমা হলে যাবে না, ছবি দেখবে না— এটা তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অধিকার। কিন্তু মুশকিল হইলো, তাঁর সেই ব্যক্তিগত অপছন্দ বা ধর্মীয় ব্যাখ্যা যখন সে সমাজের অন্য মানুষের ওপর জোরপূর্বক চাপাইয়া বলতে চায় ‘তুমিও সিনেমা দেখতে পারবা না’, তখনই মূল সংকট তৈরি হয়।”
তিনি আরও আক্ষেপ করে বলেন, দেশের ধর্মীয় শিবিরের কিছু মানুষের এমন অহেতুক ও উগ্র আচরণ আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে যেমন বারবার বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করে, ঠিক তেমনি খোদ সংশ্লিষ্ট পবিত্র ধর্মকেও এক প্রকার বিতর্কের মুখে ফেলে দেয়। এই প্রসঙ্গে নিজের অতীত স্মৃতির অবতারণা করে ফারুকী সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, আজ থেকে প্রায় ১৩ বছর আগে (২০১৩ সালে) নির্মিত তাঁর নিজস্ব সাড়াজাগানো চলচ্চিত্র ‘টেলিভিশন’-এও ঠিক একই ধরনের গোঁড়ামি ও আধুনিক সংস্কৃতির সাথে ধর্মের মেলবন্ধনের বিষয়টি সেলুলয়েডের ফিতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এত বছর পার হয়ে যাওয়ার পর, ২০২৬ সালেও এসে দেশের মাটিতে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বা ছবির প্রদর্শনী বন্ধের খবর শুনে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে চরম বিরক্ত লাগছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফেসবুক স্ট্যাটাসের শেষ অংশে ফারুকী দেশের চলচ্চিত্র ও বিনোদন মাধ্যমের মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক বন্টন বা ‘অ্যালোকেশন অব বিজনেস’ (Allocation of Business) নিয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও কাঠামোগত প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি বলেন, অনেকেই এই ঘটনার পর ক্ষুব্ধ হয়ে বর্তমান সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রীর কাছে এর উপযুক্ত ব্যাখ্যা বা জবাবদিহিতা চাইছেন। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সিনেমা বা চলচ্চিত্র খাতটি সরাসরি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেই, এটি মূলত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। তবে সাধারণ মানুষ স্বভাবসুলভভাবেই যেকোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বা চলচ্চিত্রকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সাথে সম্পর্কিত মনে করেই এই প্রশ্ন তুলছেন।
এই প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, ওটিটি (OTT Platform) এবং বিনোদনভিত্তিক টেলিভিশন খাতকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে সরাসরি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন করার পক্ষে জোরালো মত দেন। ফারুকীর ভাষায়, “প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইন্ডিয়া (ভারত) বাদে দুনিয়ার বেশিরভাগ উন্নত ও প্রগতিশীল দেশেই সিনেমা হলো বিশুদ্ধ কালচার বা সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সরকারের উচিত হবে অতি দ্রুত দেশের চলচ্চিত্রের এই অ্যালোকেশন অব বিজনেসে যুগোপযোগী পরিবর্তন আনা।”
জান্নাত সকালবেলা