‘বনলতা এক্সপ্রেস’ বন্ধের প্রতিবাদে সরব রুমিন ফারহানা

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ০৪:৩৬ অপরাহ্ণ
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ বন্ধের প্রতিবাদে সরব রুমিন ফারহানা
বিনোদন প্রতিবেদক : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রখ্যাত নির্মাতা তানিম নূরের বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর প্রদর্শনী উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর বাধার মুখে হঠাৎ স্থগিত ও বন্ধ করে দেওয়ার ন্যাক্কারজনক ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি সাফ জানিয়েছেন, যে রাষ্ট্র সমাজে শিশু ধর্ষণ, বলাৎকার কিংবা ব্যাংক লুটের মতো বড় অপরাধ ঠেকাতে ব্যর্থ, সেই রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে একটি সুস্থ ধারার পারিবারিক সিনেমা প্রদর্শন বন্ধে পরোক্ষ ভূমিকা বা মদদ রাখে—এটাই এখন সচেতন নাগরিক সমাজের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

আজ মঙ্গলবার (২ জুন) অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘বিনোদন’ ও ‘জাতীয় রাজনীতি ও নাগরিক অধিকার’ বিভাগের এক বিশেষ প্রতিবেদনে সরাইলে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন থেকে রুমিন ফারহানার দেওয়া কড়া বক্তব্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

গতকাল সোমবার (১ জুন) বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর গ্রামে ‘সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে এই প্রতিবাদী মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। কর্মসূচিতে স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ নানা শ্রেণি-পেশার শত শত মানুষ অংশ নেন।

মানববন্ধনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, “পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে দেখার উপযোগী একটি চমৎকার জীবনমুখী সিনেমা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ কেন এবং কার স্বার্থে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো এই যৌক্তিক প্রশ্নটি এখন সাধারণ জনগণের। আমি যদি আজ সোজা প্রশ্ন করি, যেই রাষ্ট্র ৬ বছরের অবলা শিশুকে ধর্ষণ আর বলাৎকার থেকে রক্ষা করতে পারে না, যেই রাষ্ট্রে প্রকাশ্য দুর্নীতি, কোটি কোটি টাকা পাচার আর ব্যাংকলুট বন্ধ করা যায় না- সেই রাষ্ট্র বা প্রশাসন কেন উগ্রবাদীদের প্রেসক্রিপশনে সিনেমা বন্ধে উল্টো মদদ দেয়?”

দেশের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে রুমিন ফারহানা বলেন, “আমরা বিগত দুই বছরের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখেছি এ দেশের একটার পর একটা ঐতিহাসিক মাজার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কবর থেকে মানুষের লাশ তুলে নিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে পোড়ানো হয়েছে। আমরা খুব নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করেছি দেশে দক্ষিণপন্থী বা ডানপন্থী চরম উগ্রবাদের এক ভয়ংকর উত্থান। কিন্তু আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যের বাংলার মাটি তো কখনো এমন উগ্র ও ধর্মান্ধ ছিল না।”

এমপি রুমিন ফারহানা নিজের শৈশব ও আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনার স্মৃতিচারণ করে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “এই একই দেশে আমরা সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে যেমন পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত শুনেছি, ঠিক তেমনি বিকেল বেলা পাড়ার ঘরে ঘরে হারমোনিয়াম নিয়ে ছোট-ছোট বাচ্চাদের সুন্দর গান প্র্যাকটিস করতে দেখেছি—এটাই আমাদের আসল বাংলাদেশ। তাহলে আজ হঠাৎ এই বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশকে কারা সুপরিকল্পিতভাবে মৌলবাদের উর্বর ভূমি বানাতে চায়?”

এ সময় তিনি অবিলম্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জুড়ে সকল প্রকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে, স্বাধীনভাবে ও নিরাপদে চলতে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানান। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “সারা দেশে ‘সংস্কৃতির রাজধানী ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ বলে যে গৌরবময় ও ঐতিহাসিক পরিচয় রয়েছে— দয়া করে সেই অনন্য পরিচয়টি কখনো কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে মুছে ফেলতে দেবেন না।” তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যেখানে ধর্মের পাশাপাশি সবরকম সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সমান্তরালে চলেছে, আজ সেটাকে বন্ধ করে দিয়ে পরের প্রজন্মকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্র যেন কোনো কুচক্রী মহলকে পরোক্ষ লাইসেন্স বা মদদ না দেয়।

উল্লেখ্য, গত ৩০ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি’। তবে স্থানীয় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের তীব্র বাধার মুখে আয়োজকরা প্রদর্শনীটি স্থগিত করতে বাধ্য হন। একই দিন রাতে কসবা উপজেলার তালতলা গ্রামে সাধারণ মানুষের জন্য আয়োজিত স্থানীয় পর্যায়ের আরেকটি প্রদর্শনী পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপে বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে সিনেমাটির কেন্দ্রীয় আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন