আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মস্কোর রেড স্কয়ারে ৯ মে প্রতিবছর যে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ হয়, তা মূলত রাশিয়ার নাগরিকদের গৌরবময় অতীত স্মরণ করানো এবং বহির্বিশ্বে ক্রেমলিন তার ভূ-রাজনৈতিক শক্তির জানান দেওয়ার একটি মহড়া। কিন্তু ২০২৬ সালের এই কুচকাওয়াজ রাশিয়ার বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।
গত বছর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত জয়ের ৮০তম বার্ষিকীতে ভ্লাদিমির পুতিনের পাশে শি জিনপিং, লুলা দা সিলভা এবং রবার্ট ফিকোর মতো বিশ্বনেতারা ছিলেন। কিন্তু এই বছর সেই লাইনআপ ছিল অত্যন্ত নগণ্য। বেলারুশ, কাজাখস্তান, লাওস, মালয়েশিয়া এবং উজবেকিস্তানের নেতারা উপস্থিত থাকলেও চীন বা ভারতের মতো কোনো ‘হেভিওয়েট’ শক্তিকে দেখা যায়নি।
ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার ভয়ে কোনো ভারী সামরিক সরঞ্জাম কুচকাওয়াজে প্রদর্শিত হয়নি। এমনকি রেড স্কয়ারও এখন আর আকাশপথের আক্রমণ থেকে নিরাপদ নয়। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তিন দিনের যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব দাবি করেছেন, যা রাশিয়ার সার্বভৌম শক্তির জন্য একটি প্রচ্ছন্ন ধাক্কা।
কাগজে-কলমে সব ঠিক মনে হলেও রাশিয়ার অন্দরমহলের চিত্রটা বেশ অন্ধকার। ২০২৪ সালে রাশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ শতাংশ, যা চলতি বছরে কমে ১ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ক্রেমলিন বিপুল অর্থ ও জনবল ‘স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন’ (SVO)-তে ঢাললেও ইউক্রেন যুদ্ধে কোনো বড় সাফল্য আসছে না। পুতিনের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা সামান্য হলেও কমতে শুরু করেছে। ইন্টারনেটে বিধিনিষেধ আরোপ করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধছে। রাশিয়া যাকে তার ‘নিয়ার অ্যাব্রোড’ বা নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্র মনে করত, সেই প্রভাব বলয় এখন দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।
এক সময় মস্কোর অনুগত আর্মেনিয়া এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি সেখানে অনুষ্ঠিত ‘ইউরোপীয় রাজনৈতিক সম্প্রদায়’ (EPC) সম্মেলনে ভলোদিমির জেলেনস্কিও উপস্থিত ছিলেন। ইইউ আর্মেনিয়ায় ২.৫ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ এবং ভিসা সহজীকরণের প্রস্তাব দিয়েছে। আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান এখন সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। দুই দেশের মধ্যে শান্তি স্থাপনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকে তারা স্বাগত জানিয়েছে। আজারবাইজান ও নাখচিভানের মধ্যে যে করিডোর তৈরির কথা চলছে, তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ট্রাম্প রুট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি’।
পুতিন হয়তো আশা করেছিলেন বিজয় দিবসের প্যারেডে আর্মেনিয়া বা আজারবাইজানের নেতাদের দেখতে পাবেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রাশিয়ার সম্পদ ও মনোযোগ ইউক্রেনে আটকে থাকায় তার দীর্ঘদিনের মিত্ররা একে একে দূরে সরে যাচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ‘নিয়ার অ্যাব্রোড’ বা নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো আসলে মানসিক ও কৌশলগতভাবে রাশিয়ার কাছ থেকে এখন অনেক দূরে অবস্থান করছে।