আজ ১৪ জুন, বিশ্ব রক্তদান দিবস
নিজস্ব প্রতিবেদক:মানবদেহের অত্যন্ত অপরিহার্য ও জীবনরক্ষাকারী উপাদান হলো রক্ত। শরীরে এর তীব্র শূন্যতা বা অ্যানিমিয়া দেখা দিলে মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা লোপ পায় এবং শরীর অকেজো হয়ে পড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিক যুগে হাত, পা কিংবা চোখ ছাড়াও কৃত্রিম সহায়তায় বেঁচে থাকা সম্ভব হলেও রক্ত ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। আর এই অতি প্রয়োজনীয় উপাদানটি কোনো ল্যাবরেটরি বা কলকারখানায় কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত করা যায় না। তাই রক্তের ঘাটতি মেটাতে মানুষকেই এগিয়ে আসতে হয়। এক ব্যাগ নিরাপদ রক্ত দিতে পারে একটি মৃত্যু পথযাত্রী জীবনের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা।
আজ রবিবার (১৪ জুন) সকালে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘জনস্বাস্থ্য, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন ও হেলথ কেয়ার গাইডলাইন খতিয়ান’ এবং ‘ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি, ব্লাড ডিসঅর্ডার স্ক্রিনিং ও হেমাটোলজি উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে বিশ্ব রক্তদান দিবসের প্রেক্ষাপট, রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা এবং এর নানাবিধ জটিলতা নিয়ে দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহর পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ তাঁর বিশেষ খতিয়ানে উল্লেখ করেন, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০৮ কোটি ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশ সংগৃহীত হয় স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের মাধ্যমে, আর বাকি ৫৯ শতাংশ আসে রোগীর আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে। উন্নত বিশ্বে প্রতি ১ হাজার মানুষের মধ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার ৪০ জন হলেও, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই হার ৪ জনেরও কম। আমাদের দেশে বছরে প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ ব্যাগ রক্তের স্থায়ী চাহিদা রয়েছে, যার মাত্র ৩১ শতাংশ মেটানো সম্ভব হয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে। চাহিদার একটি বড় অংশ এখনো পেশাদার রক্ত বিক্রেতা এবং আত্মীয়দের ওপর নির্ভরশীল, যা নিরাপদ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
রক্তের বিভিন্ন গ্রুপ (A, B, AB, O) আবিষ্কারক এবং ট্রান্সফিউশন মেডিসিনের জনক, অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ও জীববিজ্ঞানী ড. কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার ১৮৬৮ সালের ১৪ জুন জন্মগ্রহণ করেন। অতীতে রক্তস্বল্পতায় মানুষের অকাল মৃত্যু দেখে চিকিৎসকেরা যখন কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না, তখন ১৯০০ সালে ল্যান্ডস্টেইনার প্রমাণ করেন যে সব মানুষের রক্ত এক নয় এবং ভুল রক্ত দিলে মানুষের মৃত্যু অবধারিত। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ১৯৩০ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৪৬ সালের ২৬ জুন প্রয়াত হওয়া এই মহান বিজ্ঞানীর জন্মদিনকে স্মরণ করেই বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ১৪ জুন ‘বিশ্ব রক্তদান দিবস’ পালিত হয়। ২০০৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে প্রথম আন্তর্জাতিকভাবে উদযাপিত হওয়ার পর, ২০০Extended সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নিয়মিতভাবে এই দিবসটি পালন করে আসছে। এবারের ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে মানবতার এক ফোঁটা রক্ত দিন, জীবন বাঁচান।’
মেডিকেল ডায়াগনোসিস ও চিকিৎসকদের খতিয়ান অনুযায়ী, মূলত চারটি প্রধান কারণে রোগীর শরীরে রক্ত বা এর উপাদান দেওয়ার মেথড প্রয়োগ করা হয়
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ: সড়ক দুর্ঘটনা, অভ্যন্তরীণ রক্তবমি, অর্শ বা পায়খানার রাস্তা দিয়ে রক্তপাত এবং প্রস্রাবকালীন জটিল রক্তক্ষরণে সম্পূর্ণ রক্ত (Whole Blood) দিতে হয়। অস্ত্রোপচার: বড় ধরণের বা জটিল কোনো সার্জারির ক্ষেত্রে রক্তের বিকল্প থাকে না। অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা: থ্যালাসেমিয়া, হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়া এবং আয়রনের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতিজনিত রোগে লোহিত রক্তকণিকা (RBC) দেওয়া হয়। অণুচক্রিকা ও প্লাজমা: হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের অণুচক্রিকা (Platelet) এবং হিমোফিলিয়া বা আগুনে পোড়া রোগীদের ক্ষেত্রে রক্তরস বা প্লাজমা দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে।
অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সতর্ক করে বলেন, জীবন রক্ষার এই রক্তই কখনো কখনো অসাবধানতার কারণে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। পাড়ায় পাড়ায় গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন ও অবৈধ ব্লাড ব্যাংকগুলো মূলত মাদকাসক্ত পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের থেকে রক্ত সংগ্রহ করে। যথাযথ স্ক্রিনিং টেস্ট না করার ফলে এই রক্তের মাধ্যমে হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, এইডস বা সিফিলিসের মতো মারাত্মক ও সংক্রামক ব্যাধি রোগীর দেহে প্রবেশ করে।
এছাড়া ভুল গ্রুপের রক্ত পরিসঞ্চালন করলে রোগীর বুকে-পিঠে তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও হার্ট ফেইলিউরের মতো কন্ডিশন তৈরি হতে পারে। ঘন ঘন রক্ত গ্রহণকারী থ্যালাসেমিয়া রোগীদের শরীরে অতিরিক্ত আয়রন বা লৌহের আধিক্যজনিত জটিলতা দেখা দেয়। এই সোনার হরিণ বা নিরাপদ রক্তের সংকট কাটাতে প্রখ্যাত এই চিকিৎসক কিছু জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন:
পরিবারের সকলের রক্তের গ্রুপ ও ক্রস ম্যাচিং অগ্রিম জেনে রাখা। শুধুমাত্র সরকারি নিবন্ধিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত গ্রহণ করা।অপরিচিত বা পেশাদার রক্তদাতার রক্ত কেনা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা।আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত সুস্থ মানুষের রক্ত নেওয়া এবং নিজে প্রতি ৪ মাস পর পর নিয়মিত রক্তদানে অংশ নেওয়া।
মনে রাখা প্রয়োজন, রক্তের অভাব এবং অনিরাপদ রক্ত—দুটোই জীবনের জন্য সমান ঝুঁকিপূর্ণ। ভোগে নয়, বরং ত্যাগের মাধ্যমেই মানবজাতির কল্যাণ সম্ভব; তাই সুস্থ সবল নাগরিকদের নিয়মিত রক্তদানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
জান্নাত সকালবেলা
|