আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিশ্বজুড়ে চলমান তীব্র পারমাণবিক ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই চিরবৈরী রাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে এক বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের কাছে বর্তমানে গচ্ছিত রাখা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ৪০০ কেজি ওজনের উচ্চ বিশুদ্ধতাসম্পন্ন ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত ওয়াশিংটন ‘চাইলেই যেকোনো মুহূর্তে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে বা দখল করে নিতে পারে’ বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে দাবি করেছেন তিনি। তবে একই সাথে এই ধরনের চরম সামরিক পদক্ষেপ বা জবরদস্তিমূলক অবস্থান এই মুহূর্তে মার্কিন প্রশাসনের জন্য কিছুটা ‘অযৌক্তিক’ হবে বলেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন।
আজ শুক্রবার (৫ জুন) দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আন্তর্জাতিক’ ও ‘বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও মধ্যপ্রাচ্য সামরিক কৌশল উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সংবেদনশীল বিবৃতির আদ্যোপান্ত বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে (White House) মার্কিন ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বিশেষ মতবিনিময় ও প্রেস ব্রিফিং সভায় অংশ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ইরান ইস্যুতে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা ও গোয়েন্দা তথ্যের গভীরতা জাহির করেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন, “ইরানের বর্তমান মাটির নিচে বা পারমাণবিক কেন্দ্রে লুকিয়ে রাখা ইউরেনিয়ামের মজুত সফলভাবে দখল করা আমাদের সামরিক বাহিনীর জন্য আসলে কঠিন বা অসম্ভব কিছু নয়। আমরা যদি কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তা হস্তগত করতে অগ্রসর হই, তবে আমার মনে হয় না ইরানের সামরিক বাহিনী বা তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মার্কিন বাহিনীকে কোনোভাবে প্রতিরোধ করতে বা আটকাতে সক্ষম হবে।”
তিনি কিছুটা নমনীয়তা প্রকাশ করে আরও যোগ করেন, “কিন্তু এই মুহূর্তে সরাসরি গিয়ে সেই মজুত বা বাঙ্কার দখল করাটা বেশ অযৌক্তিক ও কৌশলগত ভুল হবে। আমার প্রশাসন মনে করে, আপাতত ইরানের ওপর সরাসরি এমন আগ্রাসী সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বাস্তব প্রয়োজন বা যৌক্তিকতা আমাদের সামনে নেই।”
উল্লেখ্য, সুদীর্ঘ সময় ধরে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান চরম বৈরিতার প্রধান ও মূল টেকনিক্যাল কারণ হলো ইরানের এই রহস্যময় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা ইন্টান্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি অথরিটি (IAEA)-এর সাম্প্রতিক আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান ও তথ্য অনুসারে, ইরানের গোপন পরমাণু চুল্লিগুলোতে বর্তমানে অন্তত ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে। আশঙ্কার বিষয় হলো, এই মজুতকৃত ইউরেনিয়াম ইতিমধ্যেই প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিশুদ্ধ বা পরিশোধিত করা হয়েছে। পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের মতে, এই ইউরেনিয়ামের বিশুদ্ধতার মান মাত্র ৯০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হলেই, তা দিয়ে ইরান নিমেষের মধ্যে একের পর এক শক্তিশালী পরমাণু বোমা (Nuclear Bomb) তৈরি করতে সক্ষম হবে।
ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মহলে অভিযোগ করে আসছে যে, চিকিৎসার বা শান্তিপূর্ণ বিদ্যুৎ প্রকল্পের আড়ালে ইরান মূলত গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির লক্ষ্যেই তাদের ইউরেনিয়াম বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া জ্যামিতিক হারে অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের এই দাবিকে ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে তেহরান বারবার দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে যে, তাদের এই পরমাণু প্রকল্পের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক।
ইরানের এই অত্যন্ত মূল্যবান ও বিপজ্জনক ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ঠিক কোন গোপন বাঙ্কারে বা পার্বত্য এলাকায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তা এখনো বৈশ্বিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে এক বড় রহস্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই শর্ত দিয়ে আসছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি চাইলে তেহরানকে অবশ্যই এই ক্ষতিকর পরমাণু উপাদান ওয়াশিংটনের হাতে হস্তান্তর করতে হবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমীকরণে মার্কিন সামরিক বাহিনী যে বিশেষ বিমান ও স্থল অভিযান শুরু করেছে, তার অন্যতম প্রধান ও সুপ্ত কারণ হলো ইরানের এই ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার চিরতরে হস্তগত বা ধ্বংস করা।
হোয়াইট হাউসের এই ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির (Mojtaba Khamenei) সঙ্গে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে বসা বা সাক্ষাতের বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মনোভাব জানতে চান। তারা প্রশ্ন করেন, পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করতে মোজতবা খামেনির সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কোনো আপত্তি বা দ্বিমত আছে কি না।
উত্তরে ট্রাম্প অত্যন্ত কূটনীতিসুলভ ভঙ্গিতে বলেন, “আমি নিজে থেকে যেচে বা আগ বাড়িয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে মোটেও আগ্রহী নই। তবে যদি বৈশ্বিক ভূরাজনীতির স্বার্থে বা আন্তর্জাতিক কূটনীতির নিয়মে কখনো তাঁর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ ঘটে, তবে আমি অবশ্যই সম্মানিত বোধ করব।”
ট্রাম্প আরও স্পষ্ট করে মার্কিন কূটনীতির ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, “যদি আমরা শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে একটি টেকসই ও গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে (Peace Treaty) উপনীত হতে পারি, তাহলে অবশ্যই তাদের সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে আমার সরাসরি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি হবে। সেই ধরনের পরিস্থিতিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আমি সাক্ষাৎ করতে সানন্দে রাজি আছি; অন্তত আমার তরফ থেকে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে বসতে কোনো ধরনের আপত্তি বা নিষেধাজ্ঞা নেই।”
জান্নাত সকালবেলা