স্বাস্থ্য ডেস্ক : বিশ্বজুড়ে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং মেটা-প্রযুক্তির মেলবন্ধনে এক অবিশ্বাস্য ও যুগান্তকারী বিপ্লবের সূচনা হয়েছে। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) সম্পূর্ণ কার্যকরভাবে ব্যবহার করে এক নতুন ধরনের সর্বজনীন প্রতিষেধক বা ‘সুপার-ভ্যাকসিন’ তৈরির দাবি করেছেন যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Cambridge) একদল শীর্ষস্থানীয় গবেষক। চিকিৎসকদের দাবি, এই বিশেষ টিকাটি মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে এমনভাবে বুস্ট করবে, যা সব ধরনের মারাত্মক ভাইরাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো বৈশ্বিক মহামারি প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই তা রুখে দিতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
আজ শুক্রবার (৫ জুন) দুপুর ২টা ২১ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘স্বাস্থ্য’ ও ‘মেডিকেল সায়েন্সে এআই-এর ব্যবহার, গ্লোবাল প্যান্ডেমিক কন্ট্রোল ও মডার্ন ভ্যাকসিনোলজি উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে কেমব্রিজের বিজ্ঞানীদের এই অভাবনীয় আবিষ্কারের বিবরণ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
কেমব্রিজের গবেষক দল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি-কে জানিয়েছেন, এই ভ্যাকসিনের মূল নকশা ও ইন্টারনাল আর্কিটেকচারটি সম্পূর্ণভাবে এআই-এর জটিল অ্যালগরিদমের সাহায্য নিয়ে কম্পিউটারে তৈরি করা হয়েছে। পরবর্তীতে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে সেই ডিজাইন ফুটিয়ে তুলে পরীক্ষামূলকভাবে মানুষের শরীরে (Human Clinical Trial) প্রয়োগ করে দেখা হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এ ধরনের উন্নত এআই প্রযুক্তির সরাসরি ও শতভাগ সফল ব্যবহার বিশ্বে এবারই প্রথম। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, এই সামগ্রিক গবেষণাটি ও এর ট্রায়াল প্রক্রিয়াসমূহ এখনও কিছুটা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
সাধারণত প্রচলিত নিয়মে তৈরি করা মেডিকেল ভ্যাকসিনগুলো মানুষের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট কোনো একটি সংক্রমণ বা ভাইরাস শনাক্ত করতে শেখায়। কিন্তু কিছু কিছু মারাত্মক আরএনএ ভাইরাস (যেমন কোভিড-১৯ বা ইনফ্লুয়েঞ্জা) প্রকৃতিগতভাবে খুব দ্রুত ও ঘন ঘন নিজেদের জিনগত বৈশিষ্ট্য ও রূপ বদলে ফেলে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘মিউটেশন’ (Mutation) বলা হয়। এই ঘন ঘন মিউটেশনের কারণে প্রচলিত সাধারণ ভ্যাকসিনগুলো খুব দ্রুত কার্যকারিতা হারায় বা পুরোনো হয়ে যায়। ঠিক এই কারণেই বিশ্ববাসীকে কোভিড-১৯ এবং মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার হাত থেকে বাঁচতে প্রতি বছর নিয়মিত বিরতিতে বুস্টার ডোজ বা আপডেটেড ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে হয়।
এই জটিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশেষ প্রজেক্টের প্রধান অধ্যাপক জনাথন হিনি (Professor Jonathan Heeney) অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “সাধারণত দুনিয়ায় কোনো নতুন মহামারি বা মারাত্মক ভাইরাস ছড়ানোর পর সেই ভাইরাসের স্যাম্পল নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিনের কাজ শুরু করেন। কিন্তু আমরা আমাদের নতুন গবেষণায় সম্পূর্ণ উল্টো এবং বৈপ্লবিক কিছু করার চেষ্টা করছি। আমরা এমন একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি তৈরি করেছি, যার ফলে কোনো নতুন ভাইরাস ছড়ানোর আগেই আমরা তার প্রতিষেধক নিয়ে শতভাগ প্রস্তুত থাকতে পারব।”
অধ্যাপক হিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ভাইরাসের চেয়ে সবসময় অন্তত এক ধাপ এগিয়ে থাকা। যাতে নতুন কোনো অজানা সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব বা মহামারি পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার আগেই গ্লোবাল পপুলেশনের সুরক্ষা আগাম নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল ল্যাবরেটরি সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত যেকোনো প্রচলিত টিকা বর্তমান সমাজে বিদ্যমান বা প্রচলিত ভাইরাসের নির্দিষ্ট স্ট্রেইনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। কিন্তু কেমব্রিজের গবেষকেরা এই প্রথাগত নিয়ম ভেঙে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের শত শত করোনাভাইরাসের পরিচিত সব জিনগত কোড (Genetic Code) প্রথমে ল্যাবের সার্ভারে সংগ্রহ করেন। এরপর সেই বিশাল ডেটাসেট বিশ্লেষণ করার জন্য উন্নত এআই-কে কাজে লাগানো হয়।
সংগৃহীত জিনগত কোডগুলো মিলিয়ন বার নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে এআই একটি সম্পূর্ণ নতুন ও ল্যাব-মেড ‘সুপার-অ্যান্টিজেন’ (Super-Antigen) ডিজাইন করেছে। এই বিশেষ সুপার-অ্যান্টিজেনটি করোনাভাইরাসের অতীতে ঘটে যাওয়া, বর্তমানে থাকা এবং ভবিষ্যতে হতে পারে এমন সম্ভাব্য সব ধরনের মিউটেশনের বিরুদ্ধে মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম বা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আগাম সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়। এর ফলে ভাইরাসের আকস্মিক রূপ পরিবর্তন ঘটলে কিংবা ভবিষ্যতে প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন কোনো নোভেল সংক্রমণ ছড়ালেও এআই-এর তৈরি করা এই অভেদ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা মানবদেহে সমানভাবে কার্যকর থাকবে।
অধ্যাপক জনাথন হিনি এই অভাবনীয় মেডিকেল সাকসেস নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “এই এআই ভ্যাকসিন প্রযুক্তিটি সত্যি বিস্ময়কর। বিশ্বজুড়ে মহামারির জন্য আমরা যেভাবে শত শত বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়ে আসছি, এই কম্পিউটেশনাল প্রযুক্তি সেই সনাতন পদ্ধতিতে এক আমূল ও মৌলিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে।” উল্লেখ্য, কেমব্রিজের এই সফল গবেষক দলটি ইতোমধ্যে এই একই উদ্ভাবনী এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানবজাতির জন্য অত্যন্ত মারাত্মক ইনফ্লুয়েঞ্জা ও ইবোলা ভাইরাস মোকাবিলায় আলাদা দুটি সর্বজনীন অগ্রিম ভ্যাকসিন তৈরির কাজ সফলভাবে শুরু করে দিয়েছেন।
জান্নাত সকালবেলা