কন্যাশিশুর নিরাপত্তা ও হামের প্রাদুর্ভাগে শিশুস্বাস্থ্যের সংকট

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ০৩:২৮ অপরাহ্ণ
কন্যাশিশুর নিরাপত্তা ও হামের প্রাদুর্ভাগে শিশুস্বাস্থ্যের সংকট
নিজস্ব প্রতিবেদক: সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া ফুটফুটে একটা কন্যাসন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে যে বাবার বুক আনন্দের পাশাপাশি এক বিশাল সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বের গুরুভারে কেঁপে উঠেছিল, সেই ব্যক্তিগত উদ্বেগ আজ ও আগামী দিনের সমস্ত সচেতন মা-বাবার মনে এক গভীর সামাজিক আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন সকালের সংবাদপত্রের ভেতরের পাতা, টেলিভিশনের লাল ব্রেকিং নিউজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টাইমলাইন যেন আমাদের পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে একটাই নির্মম ও তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে ‘আমাদের প্রিয় কন্যাসন্তানগুলো আজ ঠিক কোথায় নিরাপদ?’

আজ মঙ্গলবার (২ জুন) অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘মতামত’ ও ‘সমাজ, রাজনীতি ও নাগরিক অধিকার’ বিভাগের এক বিশেষ সম্পাদকীয় নিবন্ধে দেশের কন্যাশিশুদের ক্রমবর্ধমান সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং একই সাথে দেশজুড়ে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হামের (Measles) প্রাদুর্ভাবে কচি শিশুদের অকাল মৃত্যুর করুণ চিত্র বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

একসময় মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবারে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা শুরু হতো সন্তান কিছুটা বড় বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর। কিন্তু আজকের সামাজিক বাস্তবতা এতটাই কুৎসিত ও ভয়ংকর যে, কোনো বয়সই আর কন্যাসন্তানদের জন্য নিরাপদ মনে হয় না। আগে মানুষ সন্তানকে দূরে কোনো স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে অজানা আশঙ্কায় ভুগতেন না জানি কোনো নিকৃষ্ট নরপশুর লালসার শিকার হতে হয়! অথচ আজ পরিস্থিতি এমন এক আদিম যুগে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, একটি নিষ্পাপ কন্যাশিশু আজ তার নিজ চার দেয়ালের ঘরেও সুরক্ষিত নয়; আত্মীয়স্বজনের মাঝে কিংবা চেনা-পরিচিত মানুষের পরিমণ্ডলেও সে পুরোপুরি নিরাপদ থাকতে পারছে না। মাগুরার আছিয়া, কুমিল্লার তনু থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর মিরপুরে রামিসার নির্মম হত্যাকাণ্ড প্রতিটি ঘটনাই যেন আমাদের ভঙ্গুর সমাজকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক একটি জীবন্ত ও রক্তাক্ত দলিল। এসব পৈশাচিক ঘটনা শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি পরিবারের আজীবনের কান্না নয়, বরং এগুলো পুরো সভ্য জাতির সামষ্টিক বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

প্রশ্ন হলো কেন আমাদের সমাজে বারবার এমন লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে? এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশজুড়ে মাদকের, বিশেষ করে ইয়াবা ও বিভিন্ন নিষিদ্ধ মারণঘাতী নেশাজাতীয় ট্যাবলেটের ভয়াবহ ও অবাধ বিস্তার। আজ সমাজের যুবসমাজের একটি বড় অংশ এই মাদকের নীল ছোবলে নিজেদের হিতাহিত জ্ঞান ও আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিচারহীনতার দীর্ঘস্থায়ী সংস্কৃতি। নারী ও শিশু নির্যাতনের বহু সংবেদনশীল মামলা বছরের পর বছর আদালতের নথিপত্রে ঝুলে থাকে। অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনায়াসে জামিনে বের হয়ে আসে, যা নতুন অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে। আমরা এমন একটি মানবিক সমাজ চাই, যেখানে কোনো পিতাকে তাঁর কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতি রাতে আতঙ্কে কাটাতে হবে না।

সন্তান হারানোর যন্ত্রণা পৃথিবীর অন্য কোনো দুঃখের সাথে তুলনা করা যায় না। হোক সেটা কোনো নির্মম অপরাধের শিকার কিংবা রাষ্ট্রের চরম অবহেলায় কোনো বাবা-মায়ের জন্যই কোল খালি হওয়ার বেদনা সহ্য করা সম্ভব নয়। সামাজিক এই অনিরাপত্তার মাঝেই বর্তমানে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে হামের (Measles) এক ভয়াবহ ও মরণঘাতী প্রাদুর্ভাব। রাষ্ট্র আজ এই সংকটে নাকাল, সাধারণ মানুষও চরম আতঙ্কিত। অথচ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক দুঃখজনক বৈশিষ্ট্য হলো যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তখন তার চরম ব্যর্থতা বা জনস্বার্থবিরোধী গাফিলতি নিয়ে সমাজ বা সংবাদমাধ্যম তেমন একটা উচ্চকণ্ঠ হতে পারে না; কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথেই সমস্ত ব্যর্থতার ফিরিস্তি সামনে এনে রাজনৈতিক দোষারোপের সস্তা খেলা শুরু হয়।

আজ সাধারণ জনমনে যৌক্তিক প্রশ্ন উঠছে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কেন শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় হামের ভাইরাসের টিকা (Vaccine) সময়মতো কেনা হলো না? কেন মাঠপর্যায়ে এর দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেল না? বর্তমান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) নিয়মিত ও সর্বশেষ সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের তীব্র উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ২৭৯ জনে! সরকারি তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও নতুন করে ২০৮ জন নিশ্চিত হামরোগী শনাক্ত হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট ৮ হাজার ২৭৫টি শিশুর শরীরে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪৬ হাজার ৪০৭ জন নিষ্পাপ শিশু, যাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪২ হাজার ৩৩৬ জন। তবে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও শিউরে ওঠার মতো সরকারি পরিসংখ্যান হলো গত ১৫ মার্চ থেকে চলতি সময় পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে মোট মারা গেছে ৪০৫ জন শিশু এবং নিশ্চিত ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ৮৩ জনের। অর্থাৎ, এই সংক্ষিপ্ত সময়ে মহামারির মতো হামের ছোবলে দেশে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮৮ জনে!

এই বিশাল মৃত্যুর মিছিলের দায় কি রাষ্ট্র এড়াতে পারে? যদি সত্যিই স্বাস্থ্য খাতের কোনো স্তরে চরম অবহেলা বা গাফিলতি থেকে থাকে, তবে সেই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? কেন দ্রুততম সময়ে দেশজুড়ে ‘স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ জারি করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে কার্যকর আইসোলেশন (Isolation) ও টিকাদান কর্মসূচি যুদ্ধকালীন তৎপরতায় জোরদার করা হচ্ছে না? দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ ইউনিসেফ (UNICEF) বা জাতিসংঘের কূটনৈতিক ভাষার মারপ্যাঁচ বোঝে না; তারা শুধু বোঝে তাদের সন্তানের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার ও একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল কল্যাণকামী রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন