নিজস্ব প্রতিবেদক : রের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী এবং রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য প্রবীণ রাজনীতিবিদ দীপেন দেওয়ান মূলত কোনো ব্যক্তিগত শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি; বরং তিন পার্বত্য জেলার স্থানীয় জেলা পরিষদগুলোতে নিজেদের পছন্দের চেয়ারম্যান পদে সুপারিশ করাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দ্বন্দ্বের জের ধরেই তাঁর মন্ত্রিত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে এক বিস্ফোরক দাবি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সদস্য সর্বমিত্র চাকমা। তিন মাসের মাথায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মধ্যকার এমন অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে মন্ত্রিত্ব কেড়ে নেওয়ার ঘটনাকে তিনি অত্যন্ত নজিরবিহীন এবং পার্বত্যবাসীর জন্য গভীর দুঃখজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন।
আজ মঙ্গলবার (২ জুন) সকাল ১০টা ৩৯ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ ও ‘জাতীয় রাজনীতি’ বিভাগের এক বিশেষ প্রতিবেদনে ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমার ফেসবুক স্ট্যাটাস এবং পার্বত্য রাজনীতির এই নতুন মেরুকরণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক পদত্যাগের ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ ও তথ্যবহুল পোস্টে এই চাঞ্চল্যকর দাবি তোলেন সর্বমিত্র চাকমা। ফেসবুকে তিনি লেখেন, “পবিত্র ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির পর প্রথম সরকারি কর্মদিবসেই পদত্যাগ করলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক অত্যন্ত সফল মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। তিনি গতকাল সোমবার (১ জুন) সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে নিজের আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং সাথে সাথেই তা গৃহীত হয়। সরকার গঠনের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় একজন সজ্জন প্রবীণ নেতার এমন আকস্মিক পদত্যাগ নিয়ে বর্তমানে সরকার ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে নানামুখী আলোচনা ও গুঞ্জন চলছে।”
পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্ট ও ভোটের সমীকরণ মনে করিয়ে দিয়ে ডাকসুর এই সদস্য পোস্টে উল্লেখ করেন, “বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য অঞ্চলের আপামর পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠী বর্তমান শাসকদল বিএনপির ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিল। যার ফলস্বরূপ, পাহাড়ের তিনটি আসনেই (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) বিপুল ভোটে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। এই তিন বিজয়ীর মাঝে অত্যন্ত সজ্জন, মার্জিত ও সার্থক ব্যক্তিত্ব রাঙামাটি আসনের এমপি দীপেন দেওয়ান পাহাড়ের পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে সমানভাবে শ্রদ্ধার ও ভালোবাসার পাত্র।”
প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান ‘শারীরিক অসুস্থতার’ কারণ উল্লেখ করলেও সর্বমিত্র চাকমা তা পুরোপুরি নাকচ করে দেন। তিনি দাবি করেন, “অসুস্থতার কথা কাগজে-কলমে উল্লেখ করা হলেও, দীপেন দেওয়ান আসলে পার্বত্যমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় বা নিজের খুশিতে পদত্যাগ করেননি। স্রেফ পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে নিজেদের বলয়ের পছন্দের চেয়ারম্যান পদে নাম সুপারিশ করাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট তীব্র কোন্দল ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরে তাঁর সম্পূর্ণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে মাত্র তিন মাসের মাথায় এই সজ্জন মানুষের মন্ত্রিত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। একজন পূর্ণ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে এভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে মন্ত্রিত্ব কেড়ে নেওয়ার নজির বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব একটা নেই। পার্বত্যবাসীর মনে ক্ষমতার এই নোংরা দাগ ও আঘাত দীর্ঘকাল থেকে যাবে!”
এদিকে, প্রিয় নেতার এমন আকস্মিক পদত্যাগপত্র জবরদস্তিমূলকভাবে গ্রহণ করার খবর রাঙামাটিতে পৌঁছানোর পর গতকাল সোমবার বিকেল থেকেই পাহাড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র অবিলম্বে প্রত্যাহার এবং তাঁকে সসম্মানে এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পুনর্বহালের দাবিতে সোমবার বিকেলে রাঙামাটি জেলা শহরে বিশাল সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা করেছে স্থানীয় বিএনপি এবং এর সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের একটি বিশাল অংশ। শহরের কাঁঠালতলীস্থ দলীয় কার্যালয়ের সামনে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে প্রধান সড়ক অবরোধ করে এই তীব্র প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়।
উল্লেখ্য, বর্তমানে ৬৩ বছর বয়সী প্রবীণ নেতা দীপেন দেওয়ান তাঁর ছাত্রাবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সরাসরি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে পরবর্তীতে পারিবারিক ও সামাজিক চাপে পড়ে তিনি সপ্তম বিসিএস (BCS) পরীক্ষায় জুডিসিয়াল ক্যাডারে মেধার তালিকায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি বিচার বিভাগীয় কর্মকমর্তা হিসেবে চাকুরিতে যোগ দেন। দীর্ঘ ২০ বছর অত্যন্ত সততার সাথে জুডিসিয়াল সার্ভিসে দায়িত্ব পালন করে তিনি যখন ‘যুগ্ম জেলা জজ’ হিসেবে কর্মরত ছিলেন, ঠিক তখন ২০০৬ সালে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময়ে রাঙামাটির তৎকালীন উপমন্ত্রী মনিস্বপন দেওয়ান আকস্মিকভাবে দলত্যাগ করলে পার্বত্য জেলাটিতে বিএনপির যোগ্য নেতৃত্বের চরম সংকট তৈরি হয়। সেই কঠিন মুহূর্তে দলের তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও দীর্ঘ ২০ বছরের লোভনীয় বিচারকের চাকরি ইস্তফা দিয়ে পুনরায় পাহাড়ে বিএনপির হাল ধরেন এবং রাজপথে সক্রিয় হন দীপেন দেওয়ান।
জান্নাত সকালবেলা