এমপির নাম ভাঙিয়ে ও ভুয়া আইডি কার্ড ব্যবহার করে প্রতারণা

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৬ অপরাহ্ণ
এমপির নাম ভাঙিয়ে ও ভুয়া আইডি কার্ড ব্যবহার করে প্রতারণা

রেজাউল করিম মজুমদার, গাজীপুর: আওয়ামী লীগের সাবেক এক সংসদ সদস্যের (এমপি) নাম ভাঙিয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চাকরি বাগানো এবং ভুয়া পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) তৈরি করে গাজীপুরে তরুণীর সাথে প্রতারণা করে বিয়ে করার অভিযোগ উঠেছে সাইফুল ইসলাম ওরফে সজীবের বিরুদ্ধে।

বগুড়ার স্থায়ী বাসিন্দা মোঃ সাইফুল ইসলাম প্রথম স্ত্রী ও সন্তানের তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রেখে গাজীপুর সদরের মোগল খাল বাইপাস এলাকায় আরেকটি বিয়ে করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে এই প্রতারণা করা হয়।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী আসল নাম মোঃ সাইফুল ইসলাম। তবে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি ভুয়া আইডি কার্ডে তিনি নিজের নাম ব্যবহার করেছেন 'খান মোঃ হাসানুজ্জামান'। নিজেকে বিসিএস (পরিকল্পনা শাখা) ক্যাডারের সিনিয়র সহকারী সচিব পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতেন তিনি। চাকরি দেওয়ার নামে এভাবে লোকজনের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম মূলত বগুড়ার বাসিন্দা। সেখানে তার প্রথম স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। তবে নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে নিজেকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা হিসেবে জাহির করতে তিনি একটি জাল আইডি কার্ড তৈরি করেন। সরকারি চাকরি বা পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভুয়া আইডি কার্ড ব্যবহার করে এই ধরনের জালিয়াতি এবং পরিচয় গোপন করা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।

এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে এবং সরকারি বড় কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক এক এমপির নাম ও প্রভাব ব্যবহার করতেন বলে ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে।

সম্প্রতি গাজীপুরের একটি কম বয়সী মেয়ের পরিবারের সাথে সুকৌশলে যোগাযোগ গড়ে তোলেন সাইফুল ইসলাম। নিজেকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দাবি করে এবং মোটা অঙ্কের টাকার লোভ দেখিয়ে তিনি মেয়েটির পরিবারকে বিয়ের জন্য রাজি করান। শুধু তাই নয়, নিজের প্রথম বিয়ের কথা সম্পূর্ণ গোপন রাখতে তিনি এক অভিনব প্রতারণার আশ্রয় নেন। নিজের প্রথম পক্ষের স্ত্রীকে সবার সামনে নিজের ‘বোন’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাকে দিয়েই বিয়ের আলোচনা ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করান।

বিয়ের কিছুদিন পর যুবকের আচরণে সন্দেহ হলে কনের পরিবার খোঁজখবর নেওয়া শুরু করে। একপর্যায়ে জানা যায়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে তার চাকরির বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং তিনি যে আইডি কার্ডটি ব্যবহার করছিলেন তা জাল। এই চরম প্রতারণার শিকার হয়ে ভুক্তভোগী তরুণী ও তার পরিবার বর্তমানে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। এই জালিয়াতি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।

বগুড়ার এক যুবকের বিরুদ্ধে ভুয়া পরিচয় দিয়ে বিয়ে, যৌতুকের প্রলোভন ও দীর্ঘ চার বছর ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন এক ভুক্তভোগী নারী জান্নাত। তিনি নিজেকে রক্ষা করতে এবং ওই যুবকের উপযুক্ত শাস্তির দাবিতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

ভুক্তভোগী জান্নাতের ভাষ্যমতে, চার বছর আগে গরিব পরিবারের এই তরুণীকে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে এবং মা-বাবাকে রাজি করিয়ে বিয়ে করেন সাইফুল। বিয়ের পর থেকেই তিনি নিজেকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের চাকরিজীবী বলে পরিচয় দিতেন। কিন্তু সম্প্রতি ভুক্তভোগী জানতে পেরেছেন যে, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চাকরির বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। একটি ভুয়া আইডি কার্ড ব্যবহার করে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন। এছাড়া খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, বগুড়ায় তার নিজ বাড়িতে তার পূর্বেই স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে।

ভুক্তভোগী জান্নাত অভিযোগ করে আরও জানান, গত চার বছরে তাকে একবারও নিজের বাড়ীতে নিয়ে যাননি সাইফুল। উল্টো বাড়ীতে যাওয়ার কথা বললেই তাকে অমানবিক মারধর ও নির্যাতন করা হতো। প্রতারক এই স্বামীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে দেশবাসীর কাছে বিচার চেয়েছেন ভুক্তভোগী নারী জান্নাত। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।

ফৌজদারি প্রতারক মোঃ সাইফুল ইসলাম ওরফে সজীব নামের এই ব্যক্তি বলেন, ভুয়া পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) তৈরি, মন্ত্রণালয় বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার এবং সরকারি চাকরি দেওয়ার নামে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়া সহ ভুয়া পরিচিতি কাজে লাগিয়ে তিনি বেকার যুবকদের সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখাতেন এবং 'মোটা অঙ্কের টাকা' অগ্রিম লেনদেন গ্রহণ করতেন। তিনি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় এবং উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম বিক্রি করে ভুয়া সম্পর্ক প্রচার করতেন। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে তাঁর ফাঁদে ফেলতেন। স্বীকার করে সাইফুল ইসলাম বলেন, "আমি অপরাধী, অপরাধ করেছি।"

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা নাছির উদ্দিন বলেন, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশের যেকোনো সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয় দেওয়া একটি গুরুতর শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে সরকারি কর্মচারী বা কর্মকর্তা হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দেয়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এআইএল/সকালবেলা


মন্তব্য করুন