স্বর্ণের দামে উল্লম্ফন, বেড়েছে জাকাতের নিসাব ও পরিমাণ

স্বর্ণের দামে উল্লম্ফন, বেড়েছে জাকাতের নিসাব ও পরিমাণ

রমজান শুরু হতেই সামর্থ্যবান মুসলিমরা জাকাত পরিশোধের প্রস্তুতি নিলেও চলতি বছর হিসাব-নিকাশে বড় পরিবর্তন এসেছে স্বর্ণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে। আন্তর্জাতিক বাজারে ট্রয় আউন্সপ্রতি স্বর্ণের দাম গত রমজানের পর প্রায় ২,৯০০ ডলার থেকে বেড়ে ৫,১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও।

দেশে ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এক বছর পর ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে ভরিপ্রতি দাম বেড়েছে ১ লাখ ১১ হাজার টাকার বেশি। ফলে সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণের (প্রায় ৮৭.৪৮ গ্রাম) জাকাত ২৮ হাজার ১২৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার ৯৩৮ টাকা—অর্থাৎ বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার ৮১৩ টাকা।

ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক পূর্ণ চন্দ্রবছর মালিকানায় থাকলে ২.৫ শতাংশ হারে জাকাত ফরজ হয়। স্বর্ণের নিসাব ৮৫ গ্রাম এবং রূপার নিসাব ৫৯৫ গ্রাম। বর্তমানে দেশে প্রতি গ্রাম রূপার দাম প্রায় ৫৭৫ টাকা, ফলে ৫৯৫ গ্রাম রূপার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ৪২ হাজার ১২৫ টাকা। এই পরিমাণ অর্থ এক বছর সঞ্চিত থাকলে তার জাকাত হবে প্রায় ৮ হাজার ৫৫৩ টাকা।

বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, চলতি বছর ৮৫ গ্রাম স্বর্ণের সমমূল্যে নিসাব প্রায় ১৫ হাজার ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের প্রায় ৮ হাজার ডলার থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ফলে স্বর্ণভিত্তিক নিসাব ধরলে অনেকেই জাকাতের আওতার বাইরে চলে যেতে পারেন।

ইসলামিক আর্থিক বিশেষজ্ঞ ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমদুল্লাহ বলেন, স্ত্রীর গহনা তার নিজস্ব সম্পদ; নিসাব পূর্ণ হলে জাকাত দেওয়ার দায়িত্ব স্ত্রীরই। স্বামী চাইলে তার পক্ষ থেকে জাকাত আদায় করতে পারেন, তবে স্পষ্ট নিয়ত থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, জাকাতের সময় নির্ধারিত হয় সম্পদের মালিকানা শুরু হওয়ার তারিখ অনুযায়ী; রমজানে দেওয়া উত্তম হলেও বাধ্যতামূলক নয়।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সর্বশেষ ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি মূল্য নির্ধারণ করেছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকা। ২০০০ সালে যেখানে এই দাম ছিল মাত্র ৬ হাজার ৯০০ টাকা, সেখানে ২০২৬ সালে তা বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি ও অনিশ্চয়তা বাড়লে মানুষ নিরাপদ বিনিয়োগ খোঁজে; স্বর্ণ সেই ‘নীরব আশ্রয়’ হিসেবে কাজ করছে। একইভাবে মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ মনে করেন, দেশে বছরে বিপুল পরিমাণ জাকাত আহরণের সম্ভাবনা রয়েছে, যা সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, স্বর্ণ ও নগদ অর্থ একত্রে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী হিসাব করে জাকাত নির্ধারণ করা উচিত। কারণ স্বর্ণের দাম বাড়ায় নিসাবের অঙ্ক কার্যত দ্বিগুণ হয়েছে। এতে কিছু মানুষ জাকাতের আওতার বাইরে গেলেও যাদের উচ্চমূল্যের সম্পদ রয়েছে, তাদের প্রদেয় জাকাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আই.এ/সকালবেলা

মন্তব্য করুন