ইউরোপ থেকে এশিয়া বিশ্বজুড়ে রাজপথে উত্তাল জেন-জি তরুণেরা
অনলাইন ডেস্ক: ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভের ঢেউ দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের গড়া এই আন্দোলনগুলো বিশ্বজুড়ে ‘জেন-জি বিক্ষোভ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। দেশভেদে তাৎক্ষণিক কারণ ভিন্ন হলেও এসব আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, সুশাসনের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণ প্রজন্মের গভীর হতাশা।
ফ্রান্সে দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও সংস্কারের অভাবে ভুগते বিদ্যালয়গুলোর করুণ দশার প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভে লাখ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে ভারতে ভোটার তালিকা থেকে কোটি কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবং সরকারের কর্তৃত্ববাদী আচরণের বিরুদ্ধে ‘ককরোচ’ আন্দোলনের মাধ্যমে জোরালো প্রতিবাদ গড়ে তুলেছে তরুণেরা। স্পেনে আবাসন সংকট এবং জোরপূর্বক উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আইন পাস না হওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া বেলজিয়ামে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বৃদ্ধি এবং ইতালিতে যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজপথ রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। পর্তুগাল ও গ্রিসের মতো দেশগুলোতেও একই রকম অসন্তোষের আলামত দৃশ্যমান।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে ইউরোপজুড়ে আয় ও সম্পদের বৈষম্য মারাত্মকভাবে বেড়েছে। একসময় রাষ্ট্র সবার জন্য মানসম্মত সরকারি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করলেও বছরের পর বছর ব্যয় সংকোচনের ফলে সেই কল্যাণমূলক ব্যবস্থা আজ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। যাদের অর্থ আছে, তারা বেসরকারি খাতে সেবা কিনতে পারলেও সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের তরুণরা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাবা-মা বা দাদা-দাদির প্রজন্মের তুলনায় বর্তমান প্রজন্মের সামনে ভালো জীবন গড়ার সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে।
শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বল মান এবং আন্তর্জাতিক পিসা মূল্যায়নে গণিত ও পড়ার দক্ষতা কমে যাওয়ার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার। এআই বিপ্লবের কারণে প্রাথমিক স্তরের অনেক কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ায় অভিজ্ঞতাহীন তরুণদের কর্মসংস্থানে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি বর্তমান তরুণদের আয়ের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া পরিশোধে। স্পেনের মতো দেশগুলোতে আবাসনসংকট কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং এটি মানবিক মর্যাদার সংকটে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ।
বিক্ষোভ দমনে অনেক সরকারই কঠোর পুলিশি আইন, জলকামান, কাঁদানে গ্যাস এবং নির্বিচারে গ্রেপ্তারের পথ বেছে নিচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, কেবল দমনপীড়ন চালিয়ে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও এর অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না। মানসম্মত সরকারি সেবা নিশ্চিত করা, আবাসনসংকট মোকাবিলা, এআইয়ের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করলে এই অসন্তোষ আরও বড় মাপের রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
সকালবেলা / নুসরাত