চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য খাতের সংকট : ড্যাব মহাসচিব
আজ বুধবার (৩ জুন) দুপুরে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘স্বাস্থ্য’ ও ‘জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ও সাক্ষাৎকার’ বিভাগের যৌথ আয়োজনে ড্যাব মহাসচিবের সেই গুরুত্বপূর্ণ আলাপচারিতার চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য নিচে উপস্থাপন করা হলো।
স্বাস্থ্য খাতের চলমান স্থবিরতার প্রধান কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে ড্যাব মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, “আমাদের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান সমস্যা হলো তীব্র জনবল সংকট। দেশের সরকারি hospital, মেডিকেল কলেজ ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, দক্ষ নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বিপুল সংখ্যক পদ বছরের পর বছর ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় শূন্য পড়ে আছে। এই জরুরি জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সরকারকে অবিলম্বে ‘স্পেশাল বিসিএস’ (Special BCS)-এর বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করে দ্রুত একযোগে বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হবে।”
his আরও যোগ করেন, নার্সদের শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের পাশাপাশি জেলা hospital ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীনে স্থানীয়ভাবে টেকনোলজিস্টদের পৃথক নিয়োগ প্রক্রিয়া আগামী এক বছরের মধ্যে একটি মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় সম্পন্ন করা উচিত, যাতে তৃণমূলের রোগীরা ন্যূনতম সেবা থেকে বঞ্চিত না হন।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর রোগীর স্বজনদের উপর্যুপরি হামলা ও হেনস্তা প্রসঙ্গে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ডা. শাকিল বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও দুঃখজনক। বাংলাদেশের চিকিৎসক ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা বর্তমানে চরম অনিরাপদ ও বৈরী পরিবেশের মধ্যে জীবন হাতে নিয়ে কাজ করছেন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত এক মাসেই দেশের বিভিন্ন hospital ও ক্লিনিকে প্রায় ২৮ থেকে ২৯টি অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এর বাইরেও মফস্বলে এমন শত শত ঘটনা ঘটে, যা লোকলজ্জা বা হুমকির ভয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় না।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও হামলা যদি অব্যাহত থাকে, তবে চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যকার পবিত্র আস্থার সম্পর্কটি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। একজন চিকিৎসক যদি নিজের কর্মস্থলে জীবন বা শারীরিক নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন, তবে তিনি স্বাভাবিকভাবেই যেকোনো জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগী দেখার ক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক চাপে থাকবেন। ফলে তিনি রোগীকে চিকিৎসা না দিয়ে ঢাকার বড় সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে রেফার (Refer) করে দিতে বাধ্য হবেন। এতে ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর অপ্রয়োজনীয় রোগীর চাপ ও ভোগান্তি কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। তাই চিকিৎসকদের জন্য ‘নিরাপদ কর্মপরিবেশ’ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।”
স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটা ও কোটি কোটি টাকার মেডিকেল যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে চলমান দুর্নীতি প্রসঙ্গে ড্যাব মহাসচিব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বললেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আমরা বিগত দিনে দেখেছি, অনেক হাসপাতালে উপযুক্ত চার দেয়ালের ভবন তৈরি হয়নি, আইসিইউ পরিচালনার জনবল বা টেকনিশিয়ান নেই, অথচ সেখানে শত শত কোটি টাকার লাইফ সাপোর্ট ও এক্স-রে মেশিন কেনা হয়েছে! পরবর্তীতে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো বাক্সের ভেতরেই বছরের পর বছর পড়ে থেকে নষ্ট হয়েছে। এই জাতীয় অপচয় ও চুরির সিন্ডিকেট কঠোর হস্তে বন্ধ করতে হবে। যেখানে যন্ত্রপাতি দেওয়া হবে, সেখানে আগে লজিস্টিক অবকাঠামো ও জনবল প্রস্তুত নিশ্চিত করতে হবে।”
চিকিৎসকদের চাকরি ছেড়ে অন্য ক্যাডারে চলে যাওয়া এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে এই প্রখ্যাত চিকিৎসক নেতা আন্তঃক্যাডার বৈষম্যকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, “একজন চিকিৎসক দীর্ঘ ছয় বছর হাড়ভাঙা খাটুনি ও পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস দিয়ে চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও পদোন্নতি বা সুনির্দিষ্ট পদায়ন নীতিমালার অভাবে তিনি একই পদে আটকে থাকেন। অন্যদিকে, একই বিসিএসের প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তারা দ্রুত প্রমোশন পেয়ে উচ্চপদে আসীন হন। এই চরম পেশাগত বৈষম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার ট্র্যাকিংয়ের অনিশ্চয়তার কারণেই তরুণ মেধাবী চিকিৎসকেরা এখন দলে দলে সিভিল সার্ভিস ছেড়ে দিচ্ছেন অথবা উন্নত কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার খোঁজে ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমাচ্ছেন।”
দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা নতুন নতুন বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন প্রসঙ্গে ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বিদ্যমান মেডিকেল কলেজগুলোর শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। দেশের বহু মেডিকেল কলেজে এখনো বেসিক সাবজেক্টের (অ্যানাটমি, ফিজিওলজি) কোনো অধ্যাপক নেই, পর্যাপ্ত ল্যাব নেই, এমনকি শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার জন্য পর্যাপ্ত রোগীও (Bed Patient) নেই। এই মৌলিক সংকটগুলো দূর না করে কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন নতুন মেডিকেল কলেজের লাইসেন্স বা অনুমোদন দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা দেখি না।”
সর্বোপরি, ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ধরে রাখতে হলে মফস্বলে ডাক্তারদের জন্য উন্নত আবাসন, আবশ্যিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও তদবিরমুক্ত ডিজিটাল নীতিমালা প্রণয়ন করার জন্য বর্তমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি বিশেষ তাগিদ দেন এই শীর্ষ চিকিৎসক নেতা।
জান্নাত সকালবেলা
|