৫ দিন পর আবার পাঠকের টেবিলে ছাপা পত্রিকা

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ০২:২২ অপরাহ্ণ
৫ দিন পর আবার পাঠকের টেবিলে ছাপা পত্রিকা


রকিব মুহাম্মদ : টানা পাঁচ দিন পর আজ আবার সকালে দরজার নিচ দিয়ে গলিয়ে দেওয়া ছাপা পত্রিকাটা হাতে নিলেন পাঠক। চেনা গন্ধ, চেনা ভাঁজ। কিন্তু এই পাঁচ দিনের নীরবতা কি আসলেই কেবল একটা ‘উৎসবের ছুটি’ ছিল, নাকি নিউজপেপার আর রিডারের ভেতরের ইমোশনাল কানেকশনটাই আস্তে আস্তে ম্লান করে দেওয়ার এক নীরব আয়োজন?


জেন-জির ভাষায় বললে, ঈদের এই দীর্ঘ বিরতি কি শুধুই একটা ‘সিচুয়েশনশিপ ব্রেক’—নাকি পাঠককে অবহেলা করে এক প্রকার ‘ঘোস্টিং’ করা? শকুন্তলা–দুষ্মন্তের কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সম্পর্ক টিকে থাকে নিয়মিত উপস্থিতিতে; দীর্ঘ অনুপস্থিতি টান কমিয়ে দেয়। সংবাদপত্র ও পাঠকের সম্পর্কটাও ঠিক তেমনই—প্রতিদিনের ভোরে কড়া নাড়ার ভেতরেই এই বন্ধন গড়ে ওঠে।


২০২৬ সালের এই ঈদে নোয়াবের সিদ্ধান্তে টানা ৫ দিন দেশে কোনো ছাপা সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়নি। বিগত তিন বছরের খতিয়ান দেখলে বোঝা যায়, ঈদকালীন ছুটির এই মেয়াদ ৩ দিন থেকে বেড়ে এখন ৫ ও ৬ দিনে籲ন্নীত হয়েছে, যা এক প্রকার স্থায়ী রেওয়াজে রূপ নিয়েছে। ছাপা কাগজের এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির সমান্তরালে দেশে এখন হু হু করে বাড়ছে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের দাপট। তথ্যপ্রযুক্তির এই জোয়ারে পাঠক এমনিতেই স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকছেন, তার ওপর ছাপা কাগজের এমন দীর্ঘ বিরতি পাঠকদের মনস্তত্ত্বে ডিজিটাল নির্ভরশীলতাকে স্থায়ী রূপ দিচ্ছে।


রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ‘ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট ২০২৪’ পরিষ্কার দেখিয়েছে, বিশ্বব্যাপী সংবাদ গ্রহণ এখন আর নির্দিষ্ট কোনো সংবাদমাধ্যম-কেন্দ্রিক নেই; তা ক্রমশ ইউটিউব, টিকটক ও ফেসবুকের মতো সামাজিক প্ল্যাটফর্মনির্ভর হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ‘নিউজ এভয়েডেন্স’ বা সংবাদ এড়িয়ে চলার এক মারাত্মক প্রবণতা।


এই বৈশ্বিক বাস্তবতার মাঝেই প্রবীণ সাংবাদিক কামাল আহমেদ দুই বছর আগে এক কলামে তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে একটি দেশ যদি টানা sechs দিন সংবাদপত্র ছাড়া চলতে পারে, তবে বছরের বাকি দিনগুলোতেও এর কোনো প্রয়োজন নেই—পাঠকদের মনে এমন ধারণার জন্ম হওয়া স্বাভাবিক। মালিকপক্ষের এই সিদ্ধান্ত সংবাদপত্রকে পাঠকের কাছে ক্রমান্বয়ে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলছে।


একটি সংবাদপত্র এবং তার নিয়মিত পাঠকের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে একটি অলিখিত ‘সামাজিক চুক্তি’ বা বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পাঠক নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে কেবল কাগজ কেনেন না, তিনি প্রতিদিন সকালে তথ্যের নিশ্চয়তা কেনেন। উৎসবের দিনে যখন জীবনের গতি কিছুটা ধীর হয়, তখন মানুষের তথ্যের ক্ষুধা ও মানসিক তৃষ্ণা আরও বাড়ে।


ঠিক এই সময়ে টানা পরিষেবা বন্ধ রাখা সেই অলিখিত চুক্তির চরম লঙ্ঘন। মনস্তাত্ত্বিকভাবে পাঠক তখন নিজেকে ‘উপেক্ষিত’ ও ‘পরিত্যক্ত’ বোধ করেন। এই অবহেলার অভিমান থেকেই পাঠকের মনে তীব্র উদাসীনতার জন্ম হয়, যা তাঁকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে যে—যদি ৫-৬ দিন তোমায় ছাড়া বাঁচা যায়, তবে পুরো বছর কেন নয়?


ছাপা পত্রিকার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি কেবল পাঠকের অভ্যাসই বদলাচ্ছে না, বরং সামগ্রিক সমাজ ও এই শিল্পের পেছনে ৪টি বড় ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে। প্রথমত, এতে বিজ্ঞাপনের স্থায়ী স্থানান্তর ঘটে। ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে প্রিন্ট মিডিয়া বন্ধ থাকলে বড় ব্র্যান্ডগুলোর বিজ্ঞাপন বাজেট দ্রুত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চলে যায়। এই রাজস্ব একবার ডিজিটালে স্থায়ীভাবে স্থানান্তর হলে তা প্রিন্ট মিডিয়ায় ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, এতে ইতিহাসের খসড়ায় শূন্যতা তৈরি হয়।


সংবাদপত্রকে বলা হয় “ইতিহাসের প্রথম খসড়া”। টানা কয়েক দিন পত্রিকা প্রকাশ না হলে সেই সময়ের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত ইতিহাসে একটি স্থায়ী শূন্যতা তৈরি হয়, যা অনলাইন কনটেন্ট একইভাবে পূরণ করতে পারে না। তৃতীয়ত, মূলধারার সংবাদপত্রের কঠোর যাচাই-বাছাইভিত্তিক তথ্যপ্রবাহ না থাকায় এই ৫ দিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ও অপ তথ্যের মহোৎসব চলে, যা সাধারণ পাঠককে বিভ্রান্তির ঝুঁকিতে ফেলে। চতুর্থত, পাঠক আটকে যান ডিজিটাল অ্যালগরিদমের খাঁচায়।


ছাপা পত্রিকার একটি বড় সৌন্দর্য হলো এর ‘সেরেন্ডিপিটি’ বা অপ্রত্যাশিতভাবে ভালো কিছু খুঁজে পাওয়া—হয়তো খেলার পাতা ওল্টাতে গিয়ে চমৎকার একটি সম্পাদকীয় চোখের সামনে ভেসে ওঠা। কিন্তু দীর্ঘ বিরতিতে পাঠক যখন পুরোপুরি সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্দি হয়ে পড়েন, তখন তিনি আটকে যান ক্ষতিকর ডিজিটাল ‘অ্যালগরিদম’ ও ‘ইকো চেম্বারের’ খাঁচায়, যা মুক্তচিন্তার পরিপন্থী।


ছাপা সংবাদপত্রের এই বর্তমান সংকটটি যেন সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’ চলচ্চিত্রের সেই অহংকারী অথচ ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের করুণ পরিণতির এক জীবন্ত রূপক। নতুন যুগের উদীয়মান ব্যবসায়ী মহিম গাঙ্গুলির আধুনিক জলসাঘরের আলোর ঝলকানি আর মোটরগাড়ির গতির কাছে বিশ্বম্ভর রায় যেভাবে তাঁর হাতি, ঘোড়া আর পুরনো আভিজাত্য নিয়ে হেরে যাচ্ছিলেন; ঠিক একইভাবে আজ অনলাইন পোর্টাল আর স্মার্টফোনের তীব্র গতির কাছে মার খাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ছাপা কাগজ।


আমাদের সংবাদপত্র মালিকেরাও তেমনি ঈদের ছুটিতে টানা কাগজ বন্ধ রাখার মতো এক অবাস্তব ও সেকেলে আভিজাত্যের অহংকারে বুঁদ হয়ে আছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন না যে, এই দীর্ঘ নীরবতার মাধ্যমে তাঁরা আসলে তাঁদের নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ‘জলসাঘর’টির বাতি নিজ হাতেই নিভিয়ে দিচ্ছেন, যার শূন্যস্থান হু হু করে দখল করে নিচ্ছে নতুন যুগের ডিজিটাল ‘মহিম গাঙ্গুলি’রা।


আজ ৫ দিন পর আবার যখন টেবিলের ওপর ছাপা পত্রিকার পাতা উল্টানো হচ্ছে, তখন মনে এই প্রশ্ন আসা খুব স্বাভাবিক—এই কানেকশনটা কি সত্যিই দুই দিকের ছিল, নাকি আমরা পাঠক হিসেবে এতদিন শুধু একাই ইনভেস্ট করে গেছি? নাকি সম্পর্কটা আসলে ছিল একদম সিঙ্গেল-সাইডেড ক্রাশ!


লেখক: সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট।

মন্তব্য করুন