আজ শুক্রবার (৫ জুন) সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘স্বাস্থ্য’ ও ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, গ্রীষ্মকালীন রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সেল’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে হিটস্ট্রোকের পূর্ব লক্ষণ, এর পেছনে প্রধান কারণ ও চিকিৎসকদের জরুরি পরামর্শ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
মেডিকেল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিটস্ট্রোক কখনো কোনো মানুষের শরীরে আকস্মিক বা হঠাৎ করে সংঘটিত হয় না; বরং এই মারাত্মক অবস্থা তৈরি হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকেই মানুষের শরীর কিছু বিশেষ ও স্পষ্ট সংকেত দিতে শুরু করে। অনেক সময় আমরা অসচেতনতাবশত সেগুলোকে সাধারণ গরমের ক্লান্তি বা অস্বস্তি ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার ভুল করি, যা পরবর্তীতে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এশিয়ান হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন (Internal Medicine) বিভাগের প্রখ্যাত চেয়ারম্যান ডা. প্রাণজিৎ ভৌমিকের মতে, মানবদেহ বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছানোর বা ভেঙে পড়ার আগে কিছু স্পষ্ট ও দৃশ্যমান সংকেত পাঠায়। এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে বুঝতে হবে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের নিজস্ব ক্ষমতা ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে। সংকেতগুলো নিচে দেওয়া হলো:
অতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক মাত্রায় ঘাম হওয়া। শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম ক্লান্তি বা অবসাদ অনুভব করা। হঠাৎ করে মাথা ঘোরা বা শরীর একদম হালকা ও দুর্বল বোধ হওয়া। তীব্র মাথাব্যথা ও সাথে বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।শরীরের বিভিন্ন মাংসপেশিতে হঠাৎ টান লাগা বা তীব্র ক্র্যাম্প (Crump) হওয়া।
ডা. প্রাণজিৎ ভৌমিকের মতে, বদ্ধ পরিবেশ বা ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের অভাব বা ‘পুওর ভেন্টিলেশন’ (Poor Ventilation) হিটস্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ। ঘরের ভেতরে বা কর্মস্থলে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না করলে শরীর থেকে নিঃসৃত ঘাম ঠিকমতো বাষ্পীভূত হতে পারে না। ফলে শরীরের প্রাকৃতিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়। এর সঙ্গে যদি সরাসরি সূর্যের কড়া রোদ, বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে বিরতিহীন শারীরিক পরিশ্রম যুক্ত হয়, তবে সাধারণ তাপমাত্রাতেও শরীর যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। গরমে সাধারণ কিছু ভুল যা এড়িয়ে চলতে হবে
আমরা দৈনন্দিন জীবনে না জেনেই কিছু মারাত্ম ভুল করে বসি যা হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। যেমন:
সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি বা স্বাস্থ্যকর তরল খাবার পান না করা। বাইরে বের হওয়ার সময় অতিরিক্ত টাইট বা গাঢ় ও কালো রঙের পোশাক পরিধান করা। দুপুরের কড়া রোদে ছাতা, ক্যাপ বা টুপি ব্যবহার না করে সরাসরি মাথা উন্মুক্ত রাখা। তীব্র রোদের মাঝে নিয়মিত বিরতি না নিয়ে একটানা ও অলসভাবে ভারী কাজ করা।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) কক্ষে দীর্ঘক্ষণ থাকার ফলে তৃষ্ণা না পাওয়ায় পানি পানের কথা পুরোপুরি ভুলে যাওয়া। চিকিৎসকরা মনে করিয়ে দেন, ঘরের ভেতরে এসির নিচে থাকলেও মানুষের শরীর থেকে নিঃশ্বাসের সাথে পানি বের হয়ে যায়, তাই হাইড্রেশন বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
হিটস্ট্রোক সফলভাবে প্রতিরোধ করতে কেবল সাধারণ ঠান্ডা পানি পান করাই যথেষ্ট নয়। কারণ ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে পানির পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে প্রয়োজনীয় লবণ ও ইলেকট্রোলাইট (Electrolyte) বেরিয়ে যায়, যা দ্রুত পূরণ করা জরুরি। এক্ষেত্রে ঘরোয়া উপায়ে তৈরি লেবুর টাটকা শরবত, ঘোল বা ছাঁচ (Buttermilk) এবং কাঁচা আমের ঠাণ্ডা পান্না (Aam Panna) অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এই প্রাকৃতিক পানীয়গুলো শরীরের ভেতরের ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নিখুঁত রাখে এবং শরীরকে ভেতর থেকে শীতল রাখে।
গ্রীষ্মের এই সময়ে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে চিকিৎসকরা বেশ কিছু চমৎকার লাইফস্টাইল গাইডলাইন দিয়েছেন। সর্বদা হালকা রঙের, ঢিলেঢালা সুতির নরম পোশাক পরিধান করুন। দুপুরের প্রখর রোদে বাইরে যাওয়ার সময় অবশ্যই ছাতা, সানগ্লাস বা টুপি ব্যবহার করুন। কাজের মাঝে নিয়মিত ১৫ মিনিটের ছোট বিরতি নিন এবং বদ্ধ ঘরে না থেকে পর্যাপ্ত ফ্যান বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা আছে এমন স্থানে থাকার চেষ্টা করুন। সামান্যতম অসুস্থ বোধ করলেই অবহেলা না করে দ্রুত কোনো ছায়াযুক্ত বা ঠান্ডা স্থানে বিশ্রাম নিন এবং প্রচুর পানি পান করুন।
জান্নাত সকালবেলা