আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের মোহালিতে একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সুদীর্ঘ সম্পর্কের চরম টানাপোড়েন ও বিচ্ছেদের জেরে এক তরুণীকে তাঁরই সহকর্মী এবং সাবেক প্রেমিক অফিসের ভেতরে ঢুকে প্রকাশ্য দিবালোকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন। পূর্বপরিকল্পিত ও রোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত করার পর অভিযুক্ত তরুণ নিজের গলায় বারবার ছুরিকাঘাত করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন।
আজ শুক্রবার (৫ জুন) বেলা ১১টা ৭ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আন্তর্জাতিক’ ও ‘বৈশ্বিক অপরাধ, সামাজিক অবক্ষয় ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ ও পুলিশের বক্তব্য বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ৪০ মিনিটে মোহালির একটি কর্পোরেট কার্যালয়ে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার পর আজ শুক্রবার সকালে অফিসের সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরায় ধরা পড়া রোমহর্ষক ও শিউরে ওঠার মতো পুরো দৃশ্যটি প্রকাশ্যে এলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শী সহকর্মীদের বরাতে জানা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে অভিযুক্ত তরুণ হরবিন্দর মান ওরফে হ্যারি অত্যন্ত ক্ষিপ্ত অবস্থায় অফিসের ভেতরে প্রবেশ করেন। সে সময় ভুক্তভোগী তরুণী ডিম্পল নিজের ডেস্কে বসে মনোযোগ দিয়ে অফিসের কাজ করছিলেন। হ্যারি কোনো কিছু না বলেই পেছন থেকে এসে হঠাৎ করেই ডিম্পলের ওপর ধারালো ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করতে শুরু করেন।
আকস্মিক এই জীবনঘাতী হামলায় রক্তাক্ত ডিম্পল আত্মরক্ষার্থে নিজের ডেস্ক ছেড়ে অফিসের দরজার দিকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে হ্যারি ক্ষিপ্ত বাঘের মতো তাঁর পিছু নেন। তিনি অফিসের মূল প্রবেশদ্বারের কাছে ডিম্পলকে ধরে ফেলেন এবং চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে মেঝেতে এনে আবারও নির্বিচারে ছুরিকাঘাত করতে থাকেন। সে সময় অফিসের ভেতরে থাকা চার-পাঁচজন সাধারণ কর্মী হ্যারিকে বাধা দেওয়ার ও থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও তাঁর উন্মাদনার কাছে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে ডিম্পল সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে রক্তের সাগরে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও হ্যারির রাগ কমেনি; তিনি ডিম্পলের বুকে ও পিঠে ২০ বারেরও বেশি ছুরিকাঘাত করেন।
সাবেক প্রেমিকাকে সম্পূর্ণ নিশ্চিত মৃত্যুর কোলে ঢেলে দেওয়ার পর, হ্যারি অফিসের ভেতরে যে ডেস্কে ডিম্পল প্রথমে বসে কাজ করছিলেন, ঠিক সেখানে ফিরে যান। এরপর তিনি নিজের জীবনপ্রদীপ চিরতরে নিভিয়ে দিতে নিজের হাতের ওই একই রক্তমাখা ছুরি দিয়ে নিজের গলায় উপর্যুপরি আঘাত করতে শুরু করেন। হ্যারি নিজের গলায় ও শ্বাসনালীতে প্রায় ৩০ বারেরও বেশি ছুরিকাঘাত করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান।
অফিসের ভেতরে এমন অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত সহকর্মীরা চিৎকার করতে করতে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় মোহালি থানায় খবর দেন। পরবর্তীতে পুলিশ ও অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তারা দ্রুত দুজনকে উদ্ধার করে রক্তাক্ত অবস্থায় নিকটবর্তী ফোর্টিস হাসপাতালে (Fortis Hospital) নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তরুণী ডিম্পলকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, নিজের গলা কাটা অভিযুক্ত হ্যারির অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও সংকটাপন্ন বলে চিকিৎসকদের বিশেষ মেডিকেল বোর্ড জানিয়েছে।
মোহালি পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত হ্যারি এবং ভুক্তভোগী ডিম্পল গত প্রায় তিন বছর ধরে ‘প্যাকার্স অ্যান্ড মুভার্স’ (Packers & Movers) নামক একটি বেসরকারি লজিস্টিক সং系统中 একসঙ্গে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করছিলেন। এই দীর্ঘ কর্মমেয়াদের মধ্যে তাদের দুজনের মাঝে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে একটি নিবিড় প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত, কিছুদিন আগে ব্যক্তিগত কোনো কারণে তাদের সম্পর্কের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, অভিযুক্ত হ্যারি তাদের ভেঙে যাওয়া প্রেমটি আবারও জোড়া লাগানোর জন্য ডিম্পলকে প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছিলেন এবং চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ডিম্পল তাঁর সেই প্রস্তাবে কোনোভাবেই রাজি না হওয়ায় হ্যারি চরম হতাশা, ক্ষোভ ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। গতকাল বৃহস্পতিবার অফিসে তাদের মধ্যে এই সম্পর্ক নিয়ে আবারও তীব্র কথা-কাটাকাটি ও বাগবিতণ্ডা হয় এবং এর একপর্যায়ে হ্যারি ব্যাগে লুকিয়ে আনা ছুরি দিয়ে এই নৃশংস হামলা চালান।
পাঞ্জাবের পাটিয়ালার বাসিন্দা এই দুই কর্মীর পরিবারকে ইতিমধ্যেই পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি অবহিত করেছে। পাঞ্জাব পুলিশের বিশেষ ফরেনসিক দল ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা ছুরি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছে। আজ শুক্রবার ডিম্পলের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে এবং হ্যারির জ্ঞান ফিরলে তাঁকে এই হত্যা মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।
জান্নাত সকালবেলা