গুগল ম্যাপের বাইরে যে ঢাকা

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ০৫:১১ অপরাহ্ণ
গুগল ম্যাপের বাইরে যে ঢাকা

ফিচার ডেস্ক: গুগল ম্যাপ বলছে ডানে যেতে। কিন্তু রিকশাওয়ালা অভিজ্ঞ চশমা পরা চোখে মাথা নেড়ে বললেন, “ওই রাস্তা দিয়া গেলে আধা ঘণ্টা জ্যামে পইড়া থাকবেন ভাই। লন, এই গলি দিয়া যাই।”

মোবাইলের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করা গুগল ম্যাপের নীল দাগের ওপর এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকা। তারপর চোখ উঠিয়ে রিকশাওয়ালার আত্মবিশ্বাসী মুখটা দেখা। সিদ্ধান্ত বদলাতে বেশি সময় লাগেনি। কিছুক্ষণ পর যখন গন্তব্যে পৌঁছানো গেল, তখন দেখা গেল—সত্যিই ম্যাপের দেখানো মূল রাস্তাটি ছিল স্থবির, জ্যামে ঠাসা। রিকশাওয়ালার কথাই ছিল ঠিক।

ঢাকায় প্রতিদিন চলাচল করেন অথচ এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি, এমন মানুষ মেলা ভার। গুগল ম্যাপ এখন মেগাসিটি ঢাকার বাসিন্দাদের নিত্যসঙ্গী। নতুন কোনো জায়গায় যাওয়া, অচেনা রাস্তা খোঁজা কিংবা যানজট এড়াতে সময় বাঁচানোর চেষ্টা—সবকিছুতেই এই অ্যাপের ওপর আমাদের নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। তবু এক নির্মম বাস্তবতা হলো, এই জটিল আর খামখেয়ালি শহরে শুধু ডিজিটাল ম্যাপের ডেটা দিয়ে সব সময় সহজে গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না।

রিকশা, সিএনজি কিংবা লেগুনায় উঠলেই অনেক সময় যাত্রীদের এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয়। গন্তব্যের নাম বলার পরপরই চালকরা অনেক সময় ম্যাপের রুট ছেড়ে হুট করে উল্টো বা ভিন্ন কোনো বিকল্প পথ ধরেন।

এ বিষয়ে একজন মধ্যবয়সী রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বললে তিনি হেসে বলেন, “ম্যাপ দেখে লাভ নাই ভাই, এই রাস্তা বিকেলে সবসময় বন্ধ থাকে। ভিআইপি মুভমেন্ট থাকে।”

তাঁর কাছে গুগল ম্যাপ বা স্মার্টফোনের প্রযুক্তি নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই শহরের প্রতিদিনের মেজাজ, কোথায় কখন খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, কোথায় হঠাৎ করে তীব্র জ্যাম জমে গেছে—এসব জীবন্ত তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাপের চেয়েও অনেক আগে তাঁর চাকার ঘূর্ণনে জমা হয়ে যায়।

আরেকজন লেগুনা চালক বললেন, “যাত্রী অনেকে প্রথমে ম্যাপ দেইখা চিল্লাইয়া ওঠে, উল্টা পথে যাইতাছি ক্যান। পরে জ্যাম ছাড়াই যখন টাইমে পৌঁছাইয়া দেই, তখন ঠিকই নাইমা থ্যাংকু দেয়।”

ডিজিটাল যুগে এসেও ঢাকার যাত্রীদের কাছে যাতায়াতের অভিজ্ঞতাটা বেশ মিশ্র। কেউ কেউ গাড়িতে উঠে গুগল ম্যাপ খুলেই একদম চাতক পাখির মতো বসে থাকেন। আবার কেউ কেউ রিকশায় উঠেই ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে চোখ বন্ধ করে চালকের ওপর ভরসা রাখেন। কারণ তাঁরা জানেন, কৃত্রিম উপগ্রহের চেয়ে স্থানীয় পথ জানা রক্ত-মাংসের মানুষের সিদ্ধান্ত অনেক সময় বেশি কার্যকর।

নিয়মিত যাতায়াতকারী এক বেসরকারি চাকুরিজীবী বলেন, “আমি একবার ম্যাপের ওপর ১০০% ভরসা করে এক গলিতে ঢুকেছিলাম। গিয়ে দেখি রাস্তাটি দেয়াল তুলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা ম্যাপে দেখাচ্ছিল না। পরে এক রিকশাওয়ালা মামা উল্টো এসে অন্য এক চিপা গলি দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে মূল রাস্তায় নিয়ে গেলেন।”

এই ধরনের অভিজ্ঞতা ঢাকার প্রায় প্রতিটি মোড়েই কম-বেশি ঘটে। যেখানে এসে আধুনিক প্রযুক্তি থমকে দাঁড়ায়, ঠিক সেখান থেকেই যেন শুরু হয় সাধারণ মানুষের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা।

পশ্চিমা বিশ্বের মতো ঢাকা শহর শুধু ‘রোড নম্বর’ বা ‘লেন’ ধরে চলে না। এই শহরে ঠিকানা বলার নিজস্ব এক চিরন্তন ব্যাকরণ আছে।

এখানে কেউ সহজে সুনির্দিষ্ট রাস্তার নাম ধরে খোঁজেন না। ঢাকার মানুষ ঠিকানা দেয় এভাবে— “ঐ যে মোড়ের বড় মসজিদের পাশে নামবেন”, “পুরানো পেট্রোল পাম্পের উল্টো দিকে”, কিংবা “হলুদ রঙের বড় গেটটার সামনে”।

এই শহরে ডিজিটাল কোঅর্ডিনেটসের চেয়ে দৃশ্যমান ‘ল্যান্ডমার্ক’ বা চেনা স্থাপনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে গুগল ম্যাপে হয়তো আপনি কাঙ্ক্ষিত এলাকাটি খুঁজে পেলেন, কিন্তু শেষ ৫ মিনিটের পথ নিখুঁতভাবে পার হতে গেলে আপনাকে ম্যাপের নীল দাগ ছেড়ে পাশের টং দোকানের মামা কিংবা কোনো পথচারীকে মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করতেই হবে।

ঢাকার রিকশাচালক বা অন্যান্য চালকদের মাথায় এমন অনেক গুপ্ত পথ বা ‘শর্টকাট’ থাকে, যা গুগল ম্যাপের অ্যালগরিদম কল্পনাও করতে পারে না। দুই বাড়ির মাঝখানের সরু গলি, বাজারের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া বিকল্প রাস্তা, কিংবা কোনো স্কুলের ছুটির সময় কোন দিক দিয়ে জ্যাম এড়ানো যাবে—এই সব জটিল হিসাব তারা প্রতিদিনের খাটুনি থেকে শেখেন।

একই রাস্তায় সপ্তাহের কোন দিন, দিনের কোন প্রহরে যানজটের রূপ কেমন হবে—এই নিখুঁত হিসাবটা তাদের অবচেতন মনেই গেঁথে থাকে। ফলে ম্যাপ যেখানে লাল দাগ দেখিয়ে ২০ মিনিট সময় বেশি দাবি করে, চালকদের চিরচেনা শর্টকাট ম্যাপের চেয়েও ১০ মিনিট আগে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।

গুগল ম্যাপ নিঃসন্দেহে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত জরুরি এবং বৈপ্লবিক একটি আবিষ্কার। কিন্তু ঢাকা এমন এক শহর, যার চলাচল শুধু স্যাটেলাইটের ডেটা বা অ্যালগরিদম দিয়ে পুরোপুরি মাপা অসম্ভব।

এখানে প্রতি মুহূর্তে রাস্তা বদলায়, মানুষের ভিড় বদলায়, বদলায় ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারাও। আর এই প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া জীবন্ত শহরকে বুঝতে হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন মানুষের দীর্ঘদিনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা।

তাই জাদুর শহর ঢাকায় অনেক সময় গুগলের নীল দাগ শেষ কথা বলে না; শেষ কথাটি বলেন সেই মানুষটিই—যে রিকশার প্যাডেল চেপে কিংবা বাসের স্টিয়ারিং ধরে প্রতিদিন এই তপ্ত পিচঢালা রাজপথে বেঁচে থাকার লড়াই লড়ছেন।

-রাকিব হাসান/ সকালবেলা

মন্তব্য করুন