বিয়ের কয়েক ঘণ্টা পরই হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা, ভারতীয় পাইলটের মৃত্যু

প্রকাশ: সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ০৪:৩২ অপরাহ্ণ
বিয়ের কয়েক ঘণ্টা পরই হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা, ভারতীয় পাইলটের মৃত্যু
নিজস্ব প্রতিবেদক: আমেরিকার বুকে এক বুক আনন্দের মহোৎসব মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে রূপ নিল চিরস্থায়ী এক ট্র্যাজেডিতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় এক ভয়াবহ হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ বছর বয়সী এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত তরুণ বাণিজ্যিক পাইলট। নিহত যুবকের নাম ডেভ ফিজি (Dave Feejee), যিনি আমেরিকার বিখ্যাত ‘ডেল্টা এয়ারলাইনস’-এর (Delta Airlines) একজন দক্ষ পেশাদার পাইলট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

আজ সোমবার (১ জুন) বিকেল ৪টা ১১ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘বিশ্ব’ ও ‘আন্তর্জাতিক দুর্ঘটনা’ বিভাগের এক বিশেষ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ঘটে যাওয়া এই মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদারক বিমান দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘এনডিটিভি’ (NDTV)-তে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত শুক্রবার অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে নিজের নববধূকে সাথে নিয়ে রোমান্টিক মধুচন্দ্রিমায় (Honeymoon) যাচ্ছিলেন ডেভ। এ সময় তাদের বহনকারী একটি বিলাসবহুল ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ডসনভিল কাউন্টির একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিকভাবে বিধ্বস্ত হয়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বর ডেভ ফিজি এবং হেলিকপ্টারের মূল পাইলট ঘটনাস্থলেই অত্যন্ত করুণভাবে নিহত হন। তবে সৃষ্টিকর্তার অসীম দয়ায় ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ডেভের নবপরিণীতা স্ত্রী জেসনি (Jesni) অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেছেন। পেশায় নার্স জেসনি বর্তমানে মারাত্মক আহত অবস্থায় আটলান্টার একটি স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত ডেভ ফিজির আদি পরিবারের শিকড় ভারতের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায় (Kerala)। বিয়ের চরম আনন্দের মুহূর্ত শেষ হতে না হতেই এই মর্মান্তিক ও আকস্মিক দুর্ঘটনাটি কেরালার স্বজন এবং আমেরিকায় বসবাসরত পুরো পরিবারকে এক গভীর শোক ও স্তব্ধতার সাগরে নিমজ্জিত করে দিয়েছে।

পুত্রের এই অকাল মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ডেভ ফিজির বাবা জর্জ ফিজি কান্নাজড়িত কণ্ঠে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার ছেলে জেসনিকে বিয়ে করে জীবনের সবচেয়ে সুখী মানুষ হয়েছিল। প্রায় ১০ বছর আগে একটি স্থানীয় চার্চ বা গির্জায় তাদের প্রথম পরিচয় হয়েছিল, যা গত শুক্রবার চার হাত এক হওয়ার মাধ্যমে পূর্ণতা পায়।’ পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, জর্জিয়ার ডসনভিলের ‘দ্য রিভিয়ার ভেন্যু’তে জমকালো আয়োজনে অনুষ্ঠিত তাদের বিয়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রায় ৪০০ জন আমন্ত্রিত অতিথি উপস্থিত ছিলেন।

বিয়ের মূল পার্টি ও সংবর্ধনা শেষ করে অতিথিদের বিদায় জানিয়ে নবদম্পতি একটি ব্যক্তিগত ‘রবিনসন আর৬৬’ (Robinson R66) মডেলের হেলিকপ্টারে চড়ে বসেন। তাদের মূল গন্তব্য ছিল জর্জিয়ার দ্বিতীয় ব্যস্ততম বিমানবন্দর ‘ডেকাল্ব-পিচট্রি বিমানবন্দর’। এটি ছিল মূলত নতুন দম্পতির বৈবাহিক জীবন শুরু করার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে সারপ্রাইজ হিসেবে দেওয়া একটি বিশেষ লাক্সারি আয়োজন। বিমানবন্দর থেকে তাদের আটলান্টার একটি পাঁচতারা হোটেলে রাত কাটানোর কথা ছিল। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে হেলিকপ্টারটি তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। ডসন কাউন্টির একটি নির্জন ও ঘন বনাঞ্চলে, মাউন্ট ভার্নন ড্রাইভের কাছে এটি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে। দুর্ঘটনাস্থলটি তাদের মূল বিয়ের ভেন্যু থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না।

ডসন কাউন্টির পুলিশ ও উদ্ধারকারীরা জানান, এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম ও বনাঞ্চল হওয়ায় দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারী দল ও ড্রোনের মাধ্যমে হেলিকপ্টারটির সঠিক অবস্থান খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এই দীর্ঘ সময় নববধূ জেসনি মারাত্মক রক্তাক্ত ও আহত অবস্থায় প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারের ভাঙা কেবিনের ভেতরে আটকা পড়েছিলেন। ডেভের বাবা জর্জ ফিজি জানান, জেসনির শরীরে অসংখ্য গভীর কাটা ও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। উদ্ধার হওয়ার পর জেসনি চিকিৎসকদের জানিয়েছেন, জ্ঞান ফেরার পর তিনি প্রথম দেখতে পান যে তাঁর প্রিয় স্বামী ডেভ পাশে নিথর ও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন।

জর্জ ফিজি আরও বলেন, ‘জেসনি তাঁর চোখের সামনে স্বামীর এই মৃত্যু দেখে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, তবে হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে সে ধীরে ধীরে শারীরিক আঘাত থেকে সুস্থ হয়ে উঠছে।’

ডেভের বাবা এ সময় দুর্ঘটনার আগের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান, হেলিকপ্টারটি উড্ডয়নের ঠিক আগে বাইরের বৈরী আবহাওয়া ও কুয়াশা নিয়ে ডেভ নিজে একজন পেশাদার বিমানচালক হিসেবে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ডেভ হেলিকপ্টারের চালককে স্পষ্ট বলেছিলেন যে, বাইরে দৃশ্যমানতা (Visibility) প্রায় শূন্যের কোঠায় এবং এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাধারণত কোনো কপ্টার উড্ডয়ন করা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। তবে হেলিকপ্টারের প্রধান পাইলট নাকি ডেভকে অতি-আত্মবিশ্বাসের সাথে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, তারা মেঘের ওপর আরও বেশি উচ্চতায় (High Altitude) উড়ে নিরাপদে চলে যেতে পারবেন। আর সেই ভুল সিদ্ধান্তের মাশুলই দিতে হলো দুজনকে।

এদিকে, এই হাই-প্রোফাইল দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও যান্ত্রিক ত্রুটি খতিয়ে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘জাতীয় পরিবহন নিরাপত্তা বোর্ড’ (NTSB) ইতিমধ্যেই ফেডারেল তদন্ত শুরু করেছে। আবহাওয়ার প্রতিকূলতা নাকি পাইলটের ব্যক্তিগত গাফিলতি— কী কারণে হেলিকপ্টারটি বিয়ের ঠিক পরপরই বিধ্বস্ত হলো, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন