প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন। ছবি: পিএমও
অনলাইন ডেস্ক: ঈদ ঘিরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেওয়া বিভিন্ন গণমুখী উদ্যোগে প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়েছে এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি ও সুস্পষ্ট নির্দেশনায় এই ঈদে রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়বদ্ধতা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং ইতিবাচক নীতিগত পরিবর্তন দেখা গেছে। তিনি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সব সংসদ সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ এলাকায় ঈদ উদযাপন করতে বলেছেন, মানুষের পাশে থেকে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে প্রেরণা জুগিয়েছেন।
আজ সোমবার (১ জুন) বিকেলে রাজধানী তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান ও উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে সরকার প্রমাণ করেছে যে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা থাকলে সংকটের মধ্যেও স্বস্তি, শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। টানা ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন ও জবাবদিহিহীনতার যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা মুহূর্তেই বদলে ফেলা কোনো জাদুকরী মন্ত্রের পক্ষেও অসম্ভব। তবে এবারের ঈদুল আজহায় দেশের মানুষ অন্তত একটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করেছে, তা হলো রাষ্ট্রের আন্তরিক সদিচ্ছা ও জনকল্যাণমুখী প্রশাসনিক তৎপরতা। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের মাত্র তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। সময়ের পরিমাপে এটি খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য প্রতিটি দিনই জনগণের প্রতি অঙ্গীকার রক্ষার দিন। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন ও মানুষের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, এবারের ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সরকারের কার্যক্রমে ১০টি গণমুখী বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে প্রথম উদ্যোগটি ছিল নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটির সাথে সমন্বয় করে সরকারি ছুটি এক সপ্তাহ পর্যন্ত বর্ধিতকরণ এবং বিশেষ ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা। এর ফলে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন হয়েছে এবং মহাসড়কে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার যানজটের চেনা ভোগান্তি এবার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনা এবং ট্রেনের ধাক্কায় মা ও মেয়ের মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলো সরকারকে প্রচণ্ডভাবে ব্যথিত করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমিকদের ঈদের আগে বকেয়া বেতন ও বোনাস নিশ্চিত করতে ব্যাংক এবং অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়, যার ফলে বকেয়া বেতনের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ বা শিল্পাঞ্চলে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়নি।
তৃতীয় উদ্যোগ হিসেবে স্থানীয় খামারিদের স্বার্থ সুরক্ষায় সীমান্ত দিয়ে অবৈধ গবাদিপশু অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। বাজারে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ পশুর চাহিদার বিপরীতে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ, যার ফলে দেশ প্রথমবারের মতো কোরবানিতে পশুর স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। এছাড়া রাস্তার বদলে খোলা জায়গায় গরুর হাট বসানোয় মানুষ যানজট থেকে রেহাই পেয়েছে। তবে শেষের দিকে কিছু প্রান্তিক খামারি প্রত্যাশিত মূল্যে পশু বিক্রি করতে পারেননি এবং সরকার ভবিষ্যতে তাদের ন্যায্য অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি জানান। চতুর্থ উদ্যোগ হিসেবে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের বড় বড় পৌরসভাগুলোতে অতিরিক্ত জনবল নিশ্চিত করে কোরবানি পরবর্তী ৮ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে অধিকাংশ এলাকার বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। ঈদের পরদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে গাড়ি চালিয়ে মাঠপর্যায়ের বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় ঈদুল আজহার কোরবানির বর্জ্য অপসারণে অবহেলার দায়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের একাধিক আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
পঞ্চম পদক্ষেপ হিসেবে ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কাউন্টারগুলোতে কঠোর নজরদারি ছিল এবং লঞ্চে সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় ৫-৮% ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পাশাপাশি, এবারই প্রথম রেলে এবং মেট্রোরেলে নারীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে আলাদা সংরক্ষিত কোচ বা বগি চালু এবং প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এছাড়া বছিলা ও কাঞ্চন ব্রিজ এলাকায় নতুন লঞ্চঘাট স্থাপন করায় সদরঘাটের যাত্রীচাপ কমানো সম্ভব হয়েছে। ষষ্ঠ পদক্ষেপ ছিল চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট বিরোধী অভিযান। মহাসড়কে পশুবাহী গাড়ি থামিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করায় বাজারে কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারেনি। সপ্তম পদক্ষেপ হিসেবে তীব্র গরমের মধ্যেও ঈদের দিন এবং পরবর্তী দিনগুলোতে দেশের সিংহভাগ এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে।
অষ্টম উদ্যোগ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কোরবানি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয় বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর কঠোর নজরদারি জোরদার করা হয়েছিল। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামক আলোচিত মহিষটির সংরক্ষণ ও চিড়িয়াখানায় প্রেরণের মাধ্যমে সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এড়িয়ে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হয়েছে। নবম পদক্ষেপ হিসেবে লবণের জোগান নিশ্চিত করা এবং ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট ভাঙতে কাঁচা চামড়ার ন্যূনতম মূল্য আগেভাগেই নির্ধারণ করে দেয় সরকার, যার ফলে এবার চামড়া নষ্ট হওয়ার হার অনেকটাই কম ছিল। সবশেষে দশম পদক্ষেপ হিসেবে চাল, ডাল, মশলা, তেল, চিনিসহ কোরবানি-সংশ্লিষ্ট নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ টাস্কফোর্স নিয়মিত বাজার তদারকি পরিচালনা করেছে, যা উৎসবের সুযোগ নিয়ে খুচরা বাজারে হঠাৎ দাম আকাশচুম্বী হওয়া রোধে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
মাহদী আমিন তাঁর বক্তব্যের শেষে বলেন, ফ্যাসিবাদী ১৬ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ও ধ্বংসস্তূপ মাত্র তিন মাসে সম্পূর্ণরূপে দূর করা সম্ভব নয়, এই কঠিন বাস্তবতা দেশবাসী অনুধাবন করে। তবু দীর্ঘদিনের দুঃশাসনে ক্লান্ত জনগণ এবারের ঈদে উপলব্ধি করেছে যে, রাষ্ট্র তাদের প্রতি সংবেদনশীল এবং প্রশাসন কেবল ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, বরং জনসেবার কার্যকর ও দায়িত্বশীল মাধ্যম। গণমানুষের নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী দিনের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং সুশাসনের এই ধারাকে টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই হবে বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।