ধর্মীয় কারণে নয়, নদীভাঙন ও সংঘর্ষ এড়াতে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি

প্রকাশ: শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫০ অপরাহ্ণ
ধর্মীয় কারণে নয়, নদীভাঙন ও সংঘর্ষ এড়াতে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি

বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সুনাই নদীতে আগামী ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘তৌহিদী জনতা’ নামের একটি পক্ষ— এমন তথ্য কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরুর পর নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি তোলা একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, কোনো ধর্মীয় কারণ নয়, বরং এলাকার কৃষকদের ধানক্ষেত রক্ষা ও নদীভাঙন প্রতিরোধ করতেই তাঁরা এই আয়োজন বন্ধের দাবি তুলেছেন।

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন মাসুম বিন নুর উদ্দিন নামের এক যুবক। তিনি গত ১৮ আগস্ট রাত ৭টা ২৯ মিনিটে নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্টার শেয়ার করেন। সেই পোস্টারে প্রথম ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ নামটি দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে রাত ৮টা ৯ মিনিটে তিনি পোস্টটি এডিট করে আরেকটি পোস্টার যুক্ত করেন, যেখানে লেখা ছিল— ‘সুনাই নদীতে আগত নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভা’। ওই পোস্টারে ঈমানি দায়িত্ববোধ থেকে সবাইকে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানানো হয়।

দ্বিতীয় পোস্টারে ‘নৌকাবাইচ বন্ধের প্রতিবাদে পরামর্শ সভার’ কথা বলা হলেও মূলত নৌকাবাইচ বন্ধের জন্যই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান নুর উদ্দিন। শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে তিনি বলেন, ‘লেখাটি ভুলবশত হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে নৌকাবাইচ বন্ধের পক্ষে। তবে এখানে কোনো ধর্মীয় বিষয় নেই, নদীভাঙন ঠেকাতেই এ কথা বলা হয়েছে।’

পরবর্তী সময়ে নুর উদ্দিন তাঁর ফেসবুক থেকে পোস্টারটি মুছে ফেলেন। তাঁর দাবি, পরামর্শ সভার আয়োজকদের অনুরোধেই তিনি পোস্টারটি তৈরি করেছিলেন।

গত ২০ আগস্ট বারিগ্রাম বাজার মসজিদে উক্ত সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভার পর মাসুম বিন নুর উদ্দিন একটি ভিডিও প্রকাশ করেন, যা ‘মুক্ত বাতাস’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রচার করা হয়। ভিডিওটিতে স্থানীয় আলেম ও মুরুব্বিদের বক্তব্য দিতে দেখা যায়, যেখানে মূল জোর দেওয়া হয়েছে নদীভাঙন রোধ ও কৃষকদের ধান সুরক্ষার ওপর। কয়েকটি জায়গায় ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা উঠে এলেও নৌকাবাইচকে ধর্মবিরোধী বলা হয়নি। তবে এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে জুয়ার আসর বসানোর অভিযোগ তুলে সেটিকে হারাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

ভিডিওতে এক আলেমকে বলতে শোনা যায়, ‘এলাকার পরিবেশ সুন্দর রাখা, ধর্মীয় অবস্থান বজায় রাখা, বিশৃঙ্খলা এড়ানো এবং নদীভাঙন ঠেকানোর জন্যই এটি বন্ধ করা জরুরি।’

আরেকজন মুরুব্বি ভিডিওতে বলেন, ‘পূর্বে এ ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারি ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। নদীর দুই পাশে ধানের ছড়া লাগানো রয়েছে, যা নষ্ট হলে কৃষকেরা ক্ষতির মুখে পড়বেন। অসামাজিক কার্যকলাপ ও খারাপ কাজ সম্পূর্ণ হারাম, যা এলাকার ধর্মীয় পরিবেশকে ক্ষুণ্ন করে।’

প্রবীণ আলেম মাওলানা নুরুর রহমান মাসুক বলেন, ‘এটি ধর্মীয় বিষয় নয়, বরং সামাজিক ও জনস্বার্থের বিষয়। ‘তৌহিদী জনতা’ নাকি নাগরিক সমাজের ব্যানারে এটি হয়েছে, তা নিশ্চিত নই; তবে সচেতন এলাকার মানুষের মূল দাবি হলো এখানে আর নৌকাবাইচ না হওয়া।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘অতীতে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, এমনকি গানের আসরকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটেছিল। ফলে এত বড় আয়োজনকে ঘিরে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা থেকে যায়।’

অন্যদিকে, একটি পক্ষ নৌকাবাইচ বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিলেও আরেকটি পক্ষ এর সমর্থনে রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, ‘নৌকাবাইচে নদীর কোনো ক্ষতি হবে না। জুয়ার আসর বন্ধ করার দায়িত্ব প্রশাসনের। মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা কোনো সমাধান হতে পারে না। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন, যা বন্ধ করার চেষ্টা চলছে।’

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন