জামায়াতের লংমার্চের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন বিএনপির, নিবিড় নজর রাখছে দল

প্রকাশ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ
জামায়াতের লংমার্চের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন বিএনপির, নিবিড় নজর রাখছে দল
বিএনপির লোগো ও জামায়াতের লংমার্চ (ফাইল ছবি ও কোলাজ)।

 জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১-দলীয় ঐক্যের লংমার্চসহ চলমান ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর কড়া নজর রাখছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। একই সঙ্গে বিরোধী দলের এই ধরনের কর্মসূচির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানান, জাতীয় সংসদ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যে বিরোধী দলের কথার জবাব দেওয়া হলেও—তাদের এসব কর্মসূচিকে এই মুহূর্তে দলটির পক্ষ থেকে বড় কোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। এমনকি বিরোধী দলের বিপরীতে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পাল্টা রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামার কথাও এই মুহূর্তে ভাবছে না বিএনপি।

নেতাদের মতে, সরকারে থেকে বিরোধীদের প্রতিটি কর্মসূচির বিপরীতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেওয়ার চেয়ে দেশের মূল সমস্যাগুলোর সমাধানে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করাটাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এবং সরকার সেদিকেই পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছে। তবে দলের ভেতরের একটি অংশের মত হলো, জ্বালানি ও বিদ্যুৎসংকটসহ বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে বিরোধীরা যদি ধারাবাহিকভাবে মাঠে সক্রিয় থাকে, তবে তা পুরোপুরি উপেক্ষা করারও কোনো সুযোগ নেই।

উল্লেখ্য, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটের স্থায়ী সমাধান, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরে জামায়াতের নেতৃত্বে ১১-দলীয় জোট গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে সফলভাবে লংমার্চ সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে রংপুরসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতেও পর্যায়ক্রমে একই কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে জোটটি। প্রথম দফার লংমার্চের পথসভাগুলোতে জামায়াতের আমিরসহ শীর্ষ নেতারা সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনাসহ কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

বিরোধীদের এসব আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও কর্মসূচির বিপরীতে বিএনপি এখন পর্যন্ত মূলত সংসদীয় ফোরাম ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমেই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার রাখছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জাতীয় সংসদে বিরোধীদের এই লংমার্চের যৌক্তিকতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “আমরা দেখলাম, একটি বিশাল গাড়ির লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল। বাইরে বিভিন্ন মানুষ একটি কথা বলে যে জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কিছু করার অপচেষ্টা করা হয়েছিল কি না? গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করাই যেত, তাহলে আমরাই সবচেয়ে আগে লংমার্চের আয়োজন করতাম।”

এদিকে বিএনপির এই সামগ্রিক অবস্থান ও কৌশলকে ভিন্নভাবে দেখছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ মন্তব্য করেছেন যে, বিরোধী দলের কর্মসূচিকে গুরুত্ব না দিলে দলগুলো সংসদে প্রতিক্রিয়া দেখাত না। পাশাপাশি সরকারি দলের এই মুহূর্তে পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার মতো সাংগঠনিক সক্ষমতা বা নৈতিক অবস্থান নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ভাষ্যমতে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধীদের এই ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণে এমন কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি যার জন্য দলকে পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। আন্দোলন বা কর্মসূচি পালন বিরোধী দলগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবেই দেখছে বিএনপি। তবে কোনো কর্মসূচির নামে যদি জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয় বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করা হয়, তবে সরকার আইন অনুযায়ী যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে বিরোধী রাজনীতিতে থাকা বিএনপির রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ক্ষমতার আসার পর স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন হয়েছে। রাজপথের আন্দোলনের চেয়ে এখন রাষ্ট্র পরিচালনা এবং প্রশাসন সামলানোই দলটির প্রধান অগ্রাধিকার। তবে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা এবং জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্যের মতো জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলোতে জনগণের কাছে সরকারের কার্যক্রম আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন দলের কেউ কেউ।

মন্তব্য করুন