ছুটিতে হাম উপসর্গে ৫৭ শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ
ছুটিতে হাম উপসর্গে ৫৭ শিশুর মৃত্যু
জাতীয় প্রতিবেদক : পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দের ছুটির মধ্যেও দেশজুড়ে মরণব্যাধি হামের প্রকোপ অত্যন্ত ভয়াবহ এবং প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করেছে। সাধারণ মানুষ যখন ঈদের আনন্দ উদযাপনে ব্যস্ত, ঠিক তখনই দেশের হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্ত শিশুদের কান্নার রোল পড়েছে। উৎসবের এই ছুটির দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫৭ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ভাইরাসবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে আরও ৭ হাজার ১২৭ জন শিশু।

আজ সোমবার (১ জুন) সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘জাতীয়’ ও ‘স্বাস্থ্য’ বিভাগের এক বিশেষ যৌথ প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত পরিসংখ্যানের বরাতে হামের এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উৎসবের দিনগুলোতে শিশুদের এই আকস্মিক ও ব্যাপক মরণব্যাধির আক্রমণের কারণে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরিবারকে অত্যন্ত কষ্টের সাথে তাঁদের অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় ঈদ কাটাতে হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হামবিষয়ক বিশেষ তথ্য বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গত ২৪ ঘণ্টাতেও হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও ২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ৩২৪ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ৭৯১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং ল্যাব পরীক্ষায় ৫৩ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের জীবাণু (Measles) শনাক্ত হয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ বছরের জানুয়ারি মাস থেকেই মূলত দেশজুড়ে হামের প্রকোপ ক্রমান্বয়ে বাড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হওয়ায় গত ১৫ মার্চ থেকে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিতভাবে দেশের সার্বিক হাম পরিস্থিতির বুলেটিন ও তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ করছে। অধিদপ্তরের সর্বশেষ খতিয়ান বলছে, চলতি মৌসুমে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছে মোট ৭০ হাজার ৯৩৬ জন। তাদের মধ্যে শারীরিক জটিলতা বেশি থাকায় ৫৬ হাজার ৮৮৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। এছাড়া ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ৯ হাজার ৪৯ জনের শরীরে।

সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে ৩১ মে পর্যন্ত মাত্র আড়াই মাসে দেশে হাম এবং হামের পরবর্তী বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে সর্বমোট ৫৮৫ জন শিশুর অকাল প্রাণহানি ঘটেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৪৯ জনেরও বেশি শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এই রোগ। আর সর্বশেষ ১২তম সপ্তাহে (২৫ থেকে ৩১ মে— যা মূলত ঈদের ছুটির সময়) মারা গেছে ৫৭ জন শিশু এবং নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৭ হাজার ১২৭ জন।

দেশের বর্তমান এই উদ্বেগজনক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের প্রখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে আমাদের চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, হামের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান জটিলতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে নিউমোনিয়া (Pneumonia)। এবারের নিউমোনিয়া সংক্রমণটি অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে এবং শিশুদের ফুসফুসকে (Lung) খুব দ্রুত ও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলছে।”

অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত জরুরি ও সতর্কতামূলক পরামর্শ দিয়ে এই জ্যেষ্ঠ শিশু চিকিৎসক আরও বলেন, “সাধারণত হামের তীব্র জ্বর বা শরীরের লালচে র‌্যাশ (Rashes) চলে যাওয়ার পর অনেক বাবা-মা ভাবেন তাঁদের শিশু হয়তো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, হাম আক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী চার থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত একটি শিশুর শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) চরমভাবে কমে থাকে। এই সময়েই মূলত নিউমোনিয়ার মতো অন্য কোনো জীবাণু সহজেই শিশুকে আক্রমণ করে বসে। তাই র‌্যাশ চলে যাওয়ার পরও অন্তত এক মাস শিশুর পুষ্টি ও শ্বাসকষ্টের দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে।”

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন