নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির অবুজ শিশু রামিসা আক্তারকে (৭) পাশবিকভাবে ধর্ষণের পর নৃসংশভাবে শিরশ্ছেদ করে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর মোড় নিয়েছে। আজ সোমবার (১ জুন) আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জগঠন (অভিযোগ গঠন) শুনানির জন্য তোলার সময় সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছে মামলার প্রধান আসামি ঘাতক সোহেল রানা। সে দাবি করেছে, এই নৃশংস অপরাধের পেছনে ‘ডলার’ নামের মিরপুরের এক বিত্তশালী ব্যক্তি জড়িত এবং সেই মূলত শিশুটিকে হত্যা করেছে।
আজ সোমবার (১ জুন) বেলা ১১টা ২৬ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আইন-আদালত’ বিভাগের এক বিশেষ সরেজমিন প্রতিবেদনে আদালত প্রাঙ্গণে আসামির দেওয়া এই চাঞ্চল্যকর বক্তব্য ও মামলার সর্বশেষ আইনি পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এর আগে, আজ সোমবার সকাল পৌনে ৮টার দিকে মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কড়া পুলিশি পাহারায় পৃথক কারাগার থেকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় এনে রাখা হয়। পুলিশ জানায়, প্রধান আসামি সোহেলকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে নিয়ে আসা হয়।
পরবর্তীতে বেলা ১১টার কিছু পর উভয় আসামিকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে হাজির করার জন্য ডক বা এজলাসের দিকে নিয়ে যাওয়া হতে থাকে। ঠিক এই সময় করিডোরে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে প্রধান আসামি সোহেল রানা উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলতে শুরু করে, “এই ঘটনায় আমি একা দোষী না! আমার স্ত্রীরও কোনো দোষ নেই। এখানে সব দোষ হলো ডলারের। আমি শুধু মেয়েটিকে ধর্ষণ করছি, কিন্তু তাকে সরাসরি খুন করেছে বা মারছে ডলার। এই কাজের জন্য ডলার আমাকে নগদ দুই লাখ টাকা দিছে।”
এ সময় সাংবাদিকরা তার মুখে নতুন করে উঠে আসা এই ‘ডলার’ নামের ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে সোহেল রানা দ্রুত উত্তর দেয়, “সে মিরপুর ১১ নম্বর রোডের বাড়ির অনেক বড় টাকাওয়ালা মানুষ।” একই সঙ্গে সোহেল রানা আদালতে জমা দেওয়া পুলিশের রিপোর্টের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দাবি করে, তার কোনো ডিএনএ টেস্ট (DNA Test) না নিয়েই কাগজে কলমে অটোমেটিক সব লিখে দেওয়া হয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্তের বিষয়ে জানা গেছে, গত ২৪ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) অহিদুজ্জামান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তা তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে শিশুটিকে সরাসরি ধর্ষণের পর হত্যার এবং তার স্ত্রী স্বপ্নার বিরুদ্ধে এই নৃশংস অপরাধে সরাসরি সহায়তা ও আলামত ধ্বংসের অভিযোগ ল্যাব ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এই মামলায় নিহত শিশুর পিতা ও প্রতিবেশীসহ মোট ১৮ জনকে রাষ্ট্রপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী করা হয়েছে।
অভিযোগপত্র দাখিলের দিনই মামলাটি দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বার্থে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বদলি করা হয় এবং বিজ্ঞ বিচারক আজ ১ জুন আসামিদের উপস্থিতিতে চার্জ গঠনের শুনানির দিন ধার্য করেছিলেন। এর মাধ্যমে মূলত এই চাঞ্চল্যকর মামলার প্রাথমিক তদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষা, চূড়ান্ত চার্জশিট দাখিল এবং তা আদালতে আমলে নেওয়ার প্রধান চারটি ধাপ সফলভাবে শেষ হলো।
মামলাটির দ্রুত বিচার ও নিষ্পত্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে আদালতের রাষ্ট্র নিযুক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু বলেন, “এই বর্বরোচিত মামলাটির আইনি প্রক্রিয়া যেন সর্বোচ্চ দ্রুততার সাথে শেষ হয়, রাষ্ট্রপক্ষ হিসেবে আমরা সেই অর্পিত দায়িত্ব শতভাগ পালন করব। বাকি আইনি সিদ্ধান্ত ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক ও আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।” এই মামলায় স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্রুত বিচারের আশ্বাসের রাজনৈতিক প্রচারের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি পেশাদারিত্ব বজায় রেখে বলেন, “আমি আদালতের ভেতরে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে কথা বলতে রাজি নই। আমি শুধু এই মামলায় নিজের পেশাগত ও আইনি দায়িত্বটুকুই পালন করব।”
এদিকে মামলার সম্ভাব্য রায় এবং তা কার্যকর করার জটিল প্রক্রিয়া নিয়ে ঢাকার জেলা লিগ্যাল এইডের নিয়মিত আইনজীবী রায়হানা নাজনীন জুই তাঁর বিশেষ আইনি মতামতে জানান, “রামিসা হত্যা মামলার সামগ্রিক অগ্রগতি দেখে মনে হচ্ছে নিম্ন আদালতে এর রায় খুব দ্রুতই শেষ হবে। তবে বাংলাদেশে যেকোনো মামলার নিম্ন আদালতের রায় হলেই তো সব শেষ হয়ে যায় না, সাজা কার্যকর করাটাই আসল চ্যালেঞ্জ। আর সেটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় থমকে যায় মূলত উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট)। তবে নিম্ন আদালতের রায়ের পর যদি সংশ্লিষ্ট কারাগারের জেলার এবং দেশের প্রধান বিচারপতির বিশেষ হস্তক্ষেপ বা মনিটরিং পাওয়া যায়, তবে আশা করি এটি দ্রুত কার্যকর সম্ভব। না হলে ডেথ রেফারেন্স (Death Reference) সংগ্রহসহ বিভিন্ন উচ্চতর আইনি ধাপ শেষ করতে করতে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।”
বর্বরোচিত এই মামলার এজাহার ও অভিযোগ থেকে জানা গেছে, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুরের পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী শিশু রামিসা আক্তার সামান্য কাজের জন্য নিজের ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে নানা ছলে কৌশলে ফুসলিয়ে নিজেদের ফ্ল্যাটের ভেতরে নিয়ে যান। দীর্ঘক্ষণ মেয়েকে না পেয়ে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে রামিসার পরিবার ও ক্ষুব্ধ প্রতিবেশীরা ওই ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝেতে শিশু রামিসার রক্তাক্ত মস্তকবিহীন দেহ এবং বাথরুমের ভেতরের বালতিতে কাটা মাথা উদ্ধার করা হয়। এই পৈশাচিক ঘটনার পরপরই জানালার গ্রিল কেটে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও, পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
জান্নাত সকালবেলা