শিশুর মাথাব্যথা হলে করণীয় ও সতর্কতা

প্রকাশ: সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১২:১২ অপরাহ্ণ
শিশুর মাথাব্যথা হলে করণীয় ও সতর্কতা
নিজস্ব প্রতিবেদক :  আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, মাথাব্যথা কেবল বড়দেরই হয়ে থাকে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, বড়দের মতো যেকোনো বয়সের শিশুরও তীব্র বা মাঝারি মাথাব্যথা হতে পারে এবং বর্তমান সময়ে এটি শিশুদের একটি অত্যন্ত সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অবশ্য শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মাথাব্যথার লক্ষণ ও ধরনের মধ্যে কিছুটা স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। সাধারণত শিশুদের মাথাব্যথা বড়দের মতো দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হয় না; অনেক ক্ষেত্রে মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই তা নিজে নিজেই সেরে যায়। তবে বড়দের তুলনায় শিশুদের মাথাব্যথার সঙ্গে বমি বমি ভাব হওয়া কিংবা সরাসরি বমি হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি দেখা যায়।

আজ সোমবার (১ জুন) সকাল ১১টা ৫৪ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে সর্বশেষ আপডেট করা এক বিশেষ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক মতামত কলামে শিশুদের মাথাব্যথার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ কারণ ও প্রতিকারের উপায় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।


অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুদের সাময়িক মাথাব্যথা কোনো গুরুতর বা বড় রোগের কারণে হয় না। সাধারণত অতিরিক্ত ভ্যাপসা গরমে বাইরে ঘোরাঘুরি করা, পেটের বদহজমের সমস্যা বা শারীরিক অস্বস্তি, পর্যাপ্ত দৈনিক ঘুমের অভাব, সারাক্ষণ স্মার্টফোন বা ট্যাবলেটের ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকা, এমনকি পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ বা মানসিক দুশ্চিন্তা (Stress) থেকেও শিশুরা মাথাব্যথার শিকার হতে পারে। এছাড়া অনেক শিশু আবার স্রেফ সকালে স্কুল ফাঁকি দেওয়ার জন্য বা পড়তে না বসার জন্য বাবা-মায়ের কাছে মাথাব্যথার মিথ্যা অজুহাত দিয়ে থাকে। তবে খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর কোনো অভ্যন্তরীণ রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবেও শিশুর মাথাব্যথা হতে পারে, যা অবহেলা করা বিপজ্জনক।


অনেক সময় শিশুদের দৃষ্টিশক্তির বা পাওয়ারের সমস্যার কারণে তীব্র মাথাব্যথা হয়। মাথাব্যথার পাশাপাশি যদি শিশুর চোখে কোনো বিশেষ উপসর্গ দেখা দেয়— যেমন পড়ার সময় বা টিভি দেখার সময় চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়া, যেকোনো বই খুব কাছ থেকে চোখের সামনে এনে পড়া কিংবা চোখ কুঁচকে দেখার চেষ্টা করা, তবে আর দেরি না করে দ্রুত একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। সাধারণত সঠিক পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করলেই এ ধরনের মাথাব্যথা পুরোপুরি সেরে যায়।

বেশির ভাগ শিশুই অতিরিক্ত রোদ বা তীব্র গরমের তীব্রতা সহ্য করতে পারে না। অনেক সময় দেখা যায়, স্কুলের প্রাত্যহিক পিটি (PT) করার সময় বা রোদের মধ্যে অ্যাসেম্বলিতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার সময় শিশুর মাথায় তীব্র ব্যথা শুরু হয়। এ ধরনের সমস্যা এড়াতে স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে শিশুকে সবসময় ছাতা অথবা রোদটুপি (Cap) ব্যবহার করতে উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে কড়া রোদে দীর্ঘক্ষণ দৌড়াদৌড়ি করতে বারণ করতে হবে। প্রয়োজনে অভিভাবককে স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে শিশুর এই রোদজনিত সমস্যার বিষয়টি অবহিত করতে হবে।

শিশুর মাথাব্যথা যদি বংশগত কারণে হয় এবং চিকিৎসকের পরীক্ষার মাধ্যমে তা ‘মাইগ্রেন’ (Migraine) হিসেবে ডায়াগনসিস হয়, তবে চিকিৎসকের দেওয়া নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রতিরোধমূলক ওষুধ নিয়মিত মেনে চলতে হবে। এছাড়া ক্রনিক সাইনোসাইটিস (Sinusitis) বা খুব বিরল (Rare) ক্ষেত্রে ব্রেইন টিউমারের কারণেও শিশুর মাথায় স্থায়ী ব্যথা হতে পারে। এ ধরনের জটিল ক্ষেত্রে ব্যথা সব সময় খুব তীব্র নাও হতে পারে, অনেক সময় শিশু একবার বমি করার পর মাথার ব্যথা সাময়িকভাবে হালকা হয়ে যায়। শিশুর মৃগীরোগ (Epilepsy) থাকলেও মাথাব্যথা হতে পারে, এমনকি বাহ্যিক কোনো খিঁচুনি ছাড়াও এই ব্যথা প্রকাশ পেতে পারে।


আজকাল অনেক অসচেতন অভিভাবকই শিশুর সামান্য মাথাব্যথা বা শরীর ম্যাচম্যাচ করলেই চিকিৎসকের কোনো পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল (Paracetamol) বা বিভিন্ন কড়া ব্যথানাশক ওষুধ কিনে খাইয়ে দেন। চিকিৎসকদের মতে, এই অভ্যাসটি শিশুর লিভার ও কিডনির জন্য মোটেও নিরাপদ নয় এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া ঘরে নিজের ইচ্ছামতো কোনো ধরনের ব্যথার ওষুধ শিশুকে সেবন করানো থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে হবে। শিশুর মাথাব্যথা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, প্রতি সপ্তাহে ঘন ঘন হতে থাকে কিংবা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যথার তীব্রতা ও বমির ভাব ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তবে কারণ অনুযায়ী কালক্ষেপণ না করে শিশু বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ অথবা একজন নিউরোলজিস্টের (Neurologist) শরণাপন্ন হতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক রোগ ডায়াগনসিস বা চিহ্নিত করাই শিশুর ভবিষ্যৎ সুস্থতার জন্য একমাত্র অপরিহার্য ধাপ।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন