অনলাইন প্রতিবেদক : ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টির (NCP) শীর্ষ দুই নেতা কুমিল্লা জেলা পরিষদ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ২৫ কোটি টাকা তুলে নিয়েছিলেন— জেলা পরিষদের খোদ প্রশাসকের এমন এক চাঞ্চল্যকর ও বিতর্কিত বক্তব্য নিয়ে এই মুহূর্তে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় ও নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগের আঙুল ওঠে দলটির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে এককভাবে প্রায় ১০ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ সামনে আনা হয়।
আজ সোমবার (১ জুন) সকাল ১১টা ৩৯ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘জাতীয়’ ও 'রাজনীতি' বিভাগের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগের বিপরীতে হাসনাত আবদুল্লাহর দেওয়া পাল্টা জবাব ও আইনি ব্যাখ্যা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের এমন বিস্ফোরক বক্তব্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তীব্র দাবি করেছেন এনসিপির এই শীর্ষ তরুণ নেতা। জেলা পরিষদের ওই বরাদ্দ কোনো ব্যক্তিগত ফান্ড নয় উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “সরকারি রাজস্ব বরাদ্দ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দের আইনি পার্থক্য না বুঝে একজন অত্যন্ত দায়িত্বশীল সরকারি ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এমন কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। এই সমস্ত অর্থ সরকারি নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে, ব্যক্তি হিসেবে আমাদের পকেটে কোনো টাকা আসেনি।”
এর আগে, তীব্র সমালোচনার মুখে গতকাল রবিবার (৩১ মে) দিবাগত গভীর রাতে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি লাইভে আসেন এনসিপির এই প্রভাবশালী নেতা। দীর্ঘ ৪৩ মিনিটের সেই দীর্ঘ ভিডিও বার্তায় তিনি অত্যন্ত ধৈর্য্যের সাথে হাতেকলমে ওই ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।
লাইভে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “এটি মূলত সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে দেওয়া একটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ, যা জেলা পরিষদের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রশাসকের যদি রাজস্ব খাত আর বিশেষ সরকারি বরাদ্দ সম্পর্কে ন্যূনতম সাধারণ জ্ঞান থাকত, তবে তিনি কখনো এই দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলতেন না। আর উনি মিডিয়ার সামনে এমনভাবে নাটকীয়ভাবে বলেছেন, মনে হচ্ছে এই বিপুল টাকা আমরা নিজেরা পকেটে পুরে বাড়িতে নিয়ে গেছি! অথচ এই ফান্ডের প্রতিটি টাকা দেবীদ্বার উপজেলার বিভিন্ন দৃশ্যমান জনকল্যাণমূলক কাজে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।”
এনসিপির এই নেতা আরও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “এখানে সরকারের তো কোনো কিছু লুকানোর সুযোগ নেই, ডিজিটাল বাংলাদেশের সমস্ত তথ্য সরকারি ওয়েবসাইটে লাইভ আছে। দেশের যেকোনো সচেতন নাগরিক চাইলে এটি অনলাইনেই যাচাই করে দেখতে পারেন। আমি আগেও সংসদ সদস্য হিসেবে দেবীদ্বারে যেসব সরকারি বাজেট এনেছি, সবকিছুর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব এভাবে লাইভে এসে সাধারণ জনগণকে বুঝিয়ে দিয়েছি।”
হিসাবের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “যে ১০ কোটি টাকার মিথ্যা বানোয়াট কথা বলা হচ্ছে, তার আসল সত্যটা শুনুন। আমি যখন এই আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে এডিপি সাধারণ, এডিপি বিশেষ এবং রাজস্ব নিজস্ব তহবিলসহ সব মিলিয়ে সর্বমোট আট কোটি ৪২ লাখ টাকার প্রজেক্ট দেবীদ্বার উপজেলার জন্য পাস করানো হয়েছিল। এখানে এক টাকা কমও না, আবার এক টাকা বেশিও না। দেবীদ্বারের মোট ১৪৮টি ভিন্ন ভিন্ন উন্নয়ন খাতে এই প্রজেক্টগুলো বণ্টন করা হয়েছে। যার একটি প্রজেক্টও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমপ্লিট বা শেষ হয়নি, কাজ চলমান। এগুলো আপনারা সরকারি এলজিইডি বা জেলা পরিষদের অনলাইনে গেলেই স্পষ্ট দেখতে পাবেন।”
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “অথচ জেলা প্রশাসক অত্যন্ত চতুরতার সাথে বললেন আমি নাকি ১০ কোটি টাকা ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে গেছি! গত দুদিন ধরে দেশের মূলধারার বিভিন্ন মিডিয়ায় আমাদের বিরুদ্ধে একতরফা ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ চালানো হলো, যেন আমরা চুরির টাকা মানুষের কাছে লুকিয়ে রেখেছি। এটা তো লুকানোর কিছু নেই, সবকিছু ইন্টারনেটে ওপেন। ইটস ভেরি ওপেন, ব্রড ডেলাইট ওপেন (দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার)।”
এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের এই মুখ্য সংগঠক প্রপাগান্ডাকারীদের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই অপপ্রচার করেছেন— আপনাদের যদি ন্যূনতম চর্মচক্ষু থাকে এবং একটু জ্ঞানবুদ্ধি বা বিবেক থাকে, তবে শুধু ইন্টারনেটে গিয়ে সার্চ করলেই বিষয়টি পানির মতো স্পষ্ট হয়ে যায়। কোন খাতে কত টাকা গেছে এবং কোন আইনি প্রক্রিয়ায় গেছে— চাইলেই সরকারি পোর্টালে সব কিছু বের করা সম্ভব।
ডিজিটাল জবাবদিহিতার উদাহরণ টেনে হাসনাত আব্দুল্লাহ লাইভের শেষাংশে বলেন, “আমার নির্বাচনী এলাকায় সরকারের যতগুলো বরাদ্দ বা বিশেষ বাজেট এসেছে, তার সবগুলো আমি সম্প্রতি লাইভে এসে জনগণের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরেছি। এমনকি আমার ফেসবুকের নিজস্ব ‘জবাবদিহিতা’ নামক বিশেষ পেজেও এর প্রতিনিয়ত আপডেট তথ্য জনগণকে জানানো হয়। এখন সবার বাসায় স্মার্ট মোবাইল, ইন্টারনেট ও ফেসবুক আছে। সার্চ করলেই যে কেউ এর ডিটেইল দেখতে পারেন। কিন্তু এরপরও একটা সৎ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়াকে যেভাবে নোংরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ফ্রেমিং বা প্রোপাগান্ডা করা হলো, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত।”
জান্নাত সকালবেলা