হামের প্রাদুর্ভাবে শিশু হাসপাতালে কাটছে ঈদের ছুটি
আজ রবিবার (৩১ মে) পবিত্র ঈদুল আজহার টানা সরকারি ছুটির শেষ দিন। দুপুর ১টা ৩৪ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত এক বিশেষ অনুসন্ধানী ও সরেজমিন প্রতিবেদনে হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে থাকা সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট এবং দেশের হাম পরিস্থিতির এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে।
আজ সকাল ১০টায় শ্যামলীর ঢাকা শিশু হাসপাতালের প্রধান ফটকে প্রবেশ করতেই দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। হাসপাতালের দুই পাশে তিল ধারণের ঠাঁই নেই; মানুষের উপচে পড়া সমাগম। দীর্ঘ তাপদাহ আর রোদের তীব্র তাপ থেকে বাঁচতে হাসপাতালের ভেতরের চত্বরে থাকা গাছের নিচে মাদুর বা চাদর বিছিয়ে নির্ঘুম চোখে শুয়ে-বসে সময় কাটাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অসহায় অভিভাবকেরা। চেহারার চরম বিবর্ণতা আর চোখের কোণে জমে থাকা জলই বলে দিচ্ছিল— বিগত কয়েক দিন ধরে তাদের পেটে ঠিকমতো দানাপানি বা চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। সন্তানের আরোগ্যের চিন্তায় মনের গভীর অসহায়ত্ব তাদের দেহের ওপর স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে।
হাসপাতাল চত্বরে গাছের নিচে বসে থাকা এমনই এক ভাগ্যহীন বাবা আব্দুল করিমের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। নবগঠিত লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা আব্দুল করিম জীবিকার তাগিদে বর্তমানে ঢাকার আদাবর এলাকায় সপরিবারে বাস করেন এবং একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় কাজ করেন। পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য গত ২৬ মে রাত সাড়ে ১১টায় ‘ইকোনো সার্ভিস’-এর দূরপাল্লার বাসের টিকিটও কেটেছিলেন তিনি। তবে নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের পরিবর্তে গত পাঁচ দিন ধরে তাঁর ঠিকানা হয়েছে এই শিশু হাসপাতালের করিডোর।
কান্নাভেজা কণ্ঠে আব্দুল করিম বলেন, “আমার দুইটা ফুটফুটে মেয়ে সন্তান। বড়টার বয়স ১০ বছর আর ছোটটার বয়স মাত্র ৭ বছর। ২৬ মে সকাল থেকে ছোট বাচ্চাটার হঠাৎ তীব্র জ্বর, ঘন ঘন বমি আর পাতলা পায়খানা শুরু হয়। ভেবেছিলাম ঈদের আগে সাধারণ ডাক্তার দেখিয়ে কিছু ওষুধ নিয়ে একবারে গ্রামের বাড়ি চলে যাব। সেই উদ্দেশ্যে সন্ধ্যার দিকে ওকে এই শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসি। কিন্তু এখানকার কর্তব্যরত ডাক্তার জরুরি পরীক্ষা শেষে জানালেন— বাচ্চার শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিয়েছে এবং কোনোভাবেই এই অবস্থায় জার্নি করা যাবে না, দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। সন্তানের জীবনের চেয়ে তো আর ঈদ বড় নয়! সেই ২৬ তারিখ থেকে আজ ৩১ তারিখ পর্যন্ত হাসপাতালেই পড়ে আছি। আমাদের এবারের পুরো ঈদটাই সম্পূর্ণ মাটি হয়ে গেছে। ফ্যাক্টরি থেকে বেতন আর বোনাস মিলিয়ে মোট ৩০ হাজার টাকা পেয়েছিলাম, এই কয়দিনের হাসপাতালের বিল, টেস্ট আর ওষুধের পেছনে সেই জমানো টাকার সবটুকুই প্রায় শেষ হয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমার বড় মেয়েটা জীবনে কখনো বাবা-মাকে ছাড়া একা থাকেনি। নিরুপায় হয়ে ওকে ওর মামার সঙ্গে কাঁদো কাঁদো মুখে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছি। আর আমি আর ও মা এখানে ছোট বাচ্চাটার শয্যাপাশে পড়ে আছি। মাঝেমধ্যে বুকটা কেঁপে ওঠে যখন শুনি প্রতিদিন এই হাসপাতালে হামের কারণে কোনো না কোনো বাচ্চা মারা যাচ্ছে। ভয়ে ঠিকমতো ভাতও গলার ভেতর দিয়ে নামতে চায় না। তারপরও আল্লাহর কাছে দিনরাত হাত তুলে একটাই মোনাজাত করি— দয়াময় আল্লাহ যেন আমার কলিজার টুকরো সন্তানসহ দেশের সব বাচ্চার রোগ মুক্তি দিয়ে সুস্থ করে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেন।”
শুধু আব্দুল করিমই নন, শিশু সন্তানকে হাসপাতালের অন্তর্বিভাগে ভর্তি করে এভাবে বারান্দায়, করিডোরে বা খোলা আকাশের নিচে মাদুর পেতে দিনরাত কাটিয়ে দিচ্ছেন অন্তত অর্ধশত অসহায় মানুষ।
শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগের করিডোরে একটু সামনে এগোতেই চোখে পড়ে এক বিষণ্ণ মায়ের অবয়ব। পাশে দাঁড়িয়ে আছে আনুমানিক ৮ থেকে ১০ বছরের এক অবুজ কন্যাসন্তান। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই চোখের জল মুছে সেই মা জানান, “মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে এসেছি। ওর বাবা লাইনে দাঁড়িয়ে ভর্তির টিকিট কাটতে গেছে। মাত্র এক বছর আগে বাচ্চার গলার একপাশ হুট করে ফুলে গেছিল। পরে অনেক দামি টেস্ট করে চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন ওর টিবি (যক্ষ্মা) হয়েছে। সেখান থেকে এখন ইনফেকশন ছড়িয়ে গলায় ক্যানসার হয়ে গেছে। ডাক্তার বাবুরা বলেছেন আজই ওকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে কেমোথেরাপি শুরু করতে হবে, তাই ব্যাগ গুছিয়ে চলে আসলাম।” জানা গেছে, পেশায় গাড়িচালক এক দরিদ্র বাবার দুই মেয়ের মধ্যে এই বড় মেয়েটিই এত ছোট বয়সে মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত। আদরের ফুটফুটে সন্তানকে বাঁচানোর জন্য এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে জুতোর তলা ক্ষয় করছেন এই দম্পতি।
এভাবেই ঈদের আনন্দ ও খুশিকে বুকের গভীরে মাটিচাপা দিয়ে শিশু হাসপাতালের এই কক্ষ থেকে ওই কক্ষে জরুরি ফাইলের তাগাদায় অবিরত দৌড়াচ্ছে মানুষ। বাইরে মে মে করা রোদের প্রচণ্ড তাপ, ভেতরে রোগীর উপচে পড়া চাপ আর জীবন বাঁচানোর এক চরম হাহাকার— সব মিলিয়ে পুরো হাসপাতাল চত্বরে এক রোমহর্ষক ও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।
হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, বর্তমানে এই একটি হাসপাতালেই অন্তত ১১৮ জন শিশু সরাসরি হামে আক্রান্ত হয়ে কিংবা হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে বিশেষায়িত ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে ৩১ মে পর্যন্ত রেকর্ড পরিমাণ ৯৪১ জন শিশু হামের মারাত্মক জটিলতা নিয়ে এখানে ভর্তি হয়েছে এবং অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও এ পর্যন্ত মোট ৩৫ জন নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ডিজিটাল করিডোরে দায়িত্ব পালনকালে দেখা মেলে প্রতিষ্ঠানের উপ-পরিচালক ডা. আজহারুল ইসলামের। তিনি বিভিন্ন ওয়ার্ড ও আইসিইউ রুম ঘুরে ঘুরে সার্বিক চিকিৎসার তদারকি করছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, “আজ ছুটির শেষ দিন হওয়ায় সকাল থেকেই রোগীর চাপ অন্যান্য দিনের চেয়ে অনেক বেশি। একটা বিছানা খালি হওয়া মাত্রই অপেক্ষমাণ নতুন আরেকজন রোগীকে ভর্তি দিতে হচ্ছে। তবে চিকিৎসায় কোনো অবহেলা নেই। ছুটির এই দিনগুলোতেও প্রতিদিন হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকেরা নিয়মিত রাউন্ড দিয়েছেন এবং পরিচালক মহোদয়সহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন। মূলত দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত জেলা থেকে হামের জটিল রোগীরা বেশি আসছে। এখন ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলো হামের রোগী সামলাতে না পেরে সরাসরি রেফার করে এখানে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আমরা আমাদের সাধ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে এই ক্রাইসিস ম্যানেজ করার চেষ্টা করছি।”
এদিকে গতকাল শনিবার (৩০ মে) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ মহামারি বিষয়ক জাতীয় প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের হাম পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে ৩০ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া হামের কারণে ৯০ জন এবং একই সময়ে হামের তীব্র উপসর্গ ও সন্দেহভাজন হামে আক্রান্ত হয়ে রেকর্ড সংখ্যক ৪৯৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ আড়াই মাসে দেশে হামের থাবায় মোট ৫৮৩ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সময়ে দেশে নিশ্চিত হামে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৯৯৬ জনে এবং সন্দেহভাজন হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা একলাফে দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৬১২ জনে। এর মধ্যে হামের তীব্র সংক্রমণ নিয়ে সরকারি হাসপাতালে এ পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ৫৫ হাজার ৭০৫ জন শিশু এবং চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৫২ হাজার ৫০ জন।
ভৌগোলিক ও বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিশ্চিত হামের কারণে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকা বিভাগে— ৫৪ জন। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে বরিশাল বিভাগে ১৯ জন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১০ জন, সিলেট বিভাগে ৩ জন এবং ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ২ জন করে শিশুর অকাল মৃত্যু হয়েছে। পুষ্টিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তীব্র তাপদাহ, পুষ্টিহীনতা এবং যথাসময়ে হামের বুস্টার ডোজ বা টিকা না নেওয়ার কারণেই এই বছর রোগটি দেশজুড়ে এত ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করেছে।
জান্নাত সকালবেলা
|