বিড়ালের মাধ্যমে মিলল ক্যান্সার জয়ের নতুন সূত্র
আজ রবিবার (৩১ মে) বিকেল ২টা ৪০ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত এক বিশেষ বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে বিশ্ব কাঁপানো এই গবেষণার আদ্যোপান্ত বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বহু বছর ধরে গৃহপালিত পশুপাখির ক্যান্সার নিয়ে নিবিড় গবেষণা করছেন ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজশায়ারের ওয়েলকাম স্যাঙ্গার ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী লুইস ভ্যান ডার ওয়েডেন। বিড়ালের ক্যান্সার নিয়ে বিজ্ঞানীদের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তাঁর নিজের ভাষায়, “বিড়ালের ক্যান্সার এতদিন বিশ্বজুড়ে গবেষকদের কাছে ছিল এক দুর্ভেদ্য ‘ব্ল্যাক বক্স’ বা সম্পূর্ণ অজানা এক ক্ষেত্র। কারণ এই গৃহপালিত প্রাণীটির ক্যান্সারের বিষয়ে আগে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত জিনগত বা সিকোয়েন্সিংয়ের তথ্য ছিল না।”
এই রহস্যময় পরিস্থিতি আমূল বদলে দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খ্যাতনামা গবেষকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক দল গঠন করা হয়। এই গবেষক দল প্রায় ৫০০টি গৃহপালিত বিড়ালের শরীর থেকে সংগৃহীত টিউমার নমুনা অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে। দীর্ঘ গবেষণার পর প্রাপ্ত এই জাদুকরী ফলাফলটি গত ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ (Science)-এ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়।
গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা বিশদ পরীক্ষা করে দেখতে পান, মানুষ ও বিড়ালের ক্যান্সারের অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জিনগত মিল রয়েছে। বিশেষ করে ‘এফবিএক্সডব্লিউ-৭’ (FBXW7) নামের একটি প্রাকৃতিকভাবে টিউমার-দমনকারী জিন উভয় প্রজাতির ক্যান্সারের ক্ষেত্রেই প্রধান নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা রাখে। বিড়ালের স্তন ক্যান্সারে এই বিশেষ জিনের অস্বাভাবিক রূপান্তর বা মিউটেশন দেখা যায়, যা মানুষের স্তন ক্যান্সারের অত্যন্ত আগ্রাসী ও বিপজ্জনক রূপের সঙ্গে হুবহু সম্পর্কিত।
এই বিষয়ে বিজ্ঞানী ভ্যান ডার ওয়েডেন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য একটি অনন্য ও ঐতিহাসিক সুযোগ। এর মাধ্যমে একই ফর্মুলা ও সমীকরণ ব্যবহার করে একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন প্রজাতির ক্যান্সার চিকিৎসার ওষুধ ও থেরাপির উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে।”
উক্ত গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক এবং কানাডার ইউনিভার্সিটি অব গুয়েলফের বিখ্যাত ভেটেরিনারি প্যাথলজিস্ট জেফরি উড এই আবিষ্কারকে একটি চমৎকার ‘উইন-উইন’ (উভয় পক্ষের জয়) পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এই সমন্বিত গবেষণাটি মানবজাতি এবং বিড়াল সমাজ— উভয়ের জন্যই সমানভাবে আশীর্বাদ বয়ে আনবে।
বিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় বলছেন, জিনগত বিন্যাস ও ক্রোমোজোমের দিক থেকে মানুষের সঙ্গে বিড়ালের মিল চিরাচরিত গবেষণাগারে ব্যবহৃত কুকুর, গরু বা ইঁদুরের তুলনায় অনেক বেশি গভীর। পাশাপাশি, গৃহপালিত বিড়াল এবং তাদের মালিকেরা বছরের পর বছর ধরে একই ছাদের নিচে, একই ধরনের পরিবেশ ও আবহাওয়ায় বসবাস করায় তারা প্রাত্যহিক জীবনে প্রায় একই ধরনের ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান বা কার্সিনোজেনের সংস্পর্শে আসে। ফলে মানুষের জটিল রোগের গতিপ্রকৃতি সহজভাবে বুঝতে বিড়াল ভবিষ্যতে সবচেয়ে নিখুঁত গবেষণার জীবন্ত মডেল হয়ে উঠতে পারে।
উল্লেখ্য যে, এতদিন ক্যান্সার গবেষণার ট্রায়ালে কুকুরকে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক গুরুত্ব দেওয়া হতো। কারণ কুকুরের শরীরে ক্যান্সার কোষ তুলনামূলক দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং যেকোনো ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলও দ্রুত হাতে পাওয়া যায়। বিশেষ করে হাড়ের মারাত্মক ক্যান্সার ‘অস্টিওসারকোমা’ নিয়ে গবেষণায় কুকুর পূর্বে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বৃহৎ পরিসরের এই নতুন গবেষণার জন্য অস্ট্রিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, নিউজিল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলোর গৃহপালিত বিড়ালের ক্যান্সার আক্রান্ত টিস্যু বা কোষ সংগ্রহ করা হয়। গবেষকেরা ক্যান্সার-সংশ্লিষ্ট মানুষের জিনের সমতুল্য প্রায় এক হাজারটি বিড়ালের জিন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেন।
চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, শুধু স্তন ক্যান্সারই নয়; বরং মানুষের রক্ত (লিউকেমিয়া), হাড়, ফুসফুস, ত্বক, পরিপাকতন্ত্র এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের (মস্তিষ্ক) ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও মানুষ ও বিড়ালের আক্রান্ত কোষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও অভিন্ন মিল রয়েছে।
গবেষণায় আরও একটি বড় আশার কথা বলা হয়েছে যে, ‘ভিনক্রিস্টিন’ (Vincristine) নামের প্রচলিত একটি কেমোথেরাপি ওষুধ বিড়ালের স্তন ক্যান্সার চিকিৎসায় দারুণ কার্যকর হতে পারে। প্রসঙ্গত, বিড়ালের স্তন ক্যান্সার হলো তাদের সামগ্রিক রোগব্যাধির মধ্যে তৃতীয় সর্বাধিক সাধারণ ক্যান্সার এবং এটি সাধারণত অত্যন্ত প্রাণঘাতী ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া প্রকৃতির হয়ে থাকে।
জেফরি উড আরও বলেন, “আগে আমরা অন্ধকারে ঢিল ছুড়তাম, জানতাম না ক্যান্সারে আক্রান্ত বিড়ালের জন্য মানুষের কোন ওষুধটি আসলে কার্যকর হতে পারে। এখন অন্তত আমাদের ল্যাবরেটরিতে সম্ভাব্য শতভাগ কার্যকর ওষুধের একটি বৈজ্ঞানিক তালিকা তৈরি আছে, যা নিয়ে খুব দ্রুতই আমরা মাঠপর্যায়ে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করতে পারব।”
তবে এই ঐতিহাসিক আবিষ্কারে বিশ্বজুড়ে আশার আলো সঞ্চারিত হলেও গবেষকেরা কিছুটা সতর্কবাণীও উচ্চারণ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, এই আবিষ্কার অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও মানুষের জটিল ক্যান্সার চিকিৎসায় এর চূড়ান্ত রূপ ও শতভাগ কার্যকারিতা বুঝতে আরও কিছুটা সময় ও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার ভেটেরিনারি মেডিসিন বিভাগের প্রখ্যাত অধ্যাপক জেইমি মোদিয়ানোর ভাষায়, “ক্যান্সার জয়ের হাজার মাইলের দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রায় এটি কেবল আমাদের প্রথম দৃঢ় পদক্ষেপ মাত্র।”
জান্নাত সকালবেলা
|