কংগ্রেসে বিলীন হচ্ছে মমতার তৃণমূল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) কি তবে চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে চলেছে? ১৯৯৭ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের হাইকম্যান্ডের সাথে মতবিরোধের জেরে দল ছেড়ে বেরিয়ে এসে যে নতুন সাম্রাজ্য গড়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তা কি আবার তিন দশক পর মূল কংগ্রেসেই বিলীন হতে যাচ্ছে? ওপার বাংলার নির্বাচনী বিপর্যয় এবং দলটির অভ্যন্তরে শুরু হওয়া নজিরবিহীন গণ-বিদ্রোহের জেরে বর্তমানে নয়াদিল্লির রাজনৈতিক পাড়ায় এই ঐতিহাসিক ‘ঘর ওয়াপসি’ বা ঘরে ফেরার গুঞ্জন তীব্র ডালপালা মেলছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘সার্ক ভূরাজনীতি, ভারতের নির্বাচন ও ওপার বাংলা শাসনব্যবস্থা খতিয়ান’ এবং ‘কংগ্রেস হাইকম্যান্ড, সংসদীয় রণকৌশল ও দলীয় নীতি উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে তৃণমূলের এই চরম রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকট ও কংগ্রেসের সাথে সম্ভাব্য একীভূতকরণের আদ্যোপান্ত খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’-র বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে নিজের দলের বিধায়ক ও এমপিদের প্রকাশ্য বিদ্রোহ এবং তৃণমূলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের ওপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমানে কলকাতায় না থেকে দিল্লিতে অবস্থান করছেন। গত মঙ্গলবার ও বুধবার দিল্লির ১০ জনপথ রোডে সোনিয়া গান্ধীর বাসভবনে গিয়ে দীর্ঘ কয়েক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো একান্ত রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন মমতা। একই সময়ে মমতার ভাতিজা তথা টিএমসির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে বৈঠক করেছেন কংগ্রেসের কার্যত প্রধান রাহুল গান্ধীর সাথে। বিরোধী জোট ‘ইনডিয়া’ (INDIA)-র এই শীর্ষ নেতাদের ঘনঘন বৈঠকই প্রমাণ করছে যে, পর্দার আড়ালে বড় কোনো রাজনৈতিক চুক্তি সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।
টানা ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী থাকা মমতার দল একসময় দুর্নীতি, বলপ্রয়োগ ও দমনের মাধ্যমে রাজ্যজুড়ে ইস্পাত-দৃঢ় শাসন কায়েম করেছিল। কিন্তু গত ৪ মে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর এক দশকেরও বেশি সময়ের দুঃশাসন যেন দলটির ওপর কাল হয়ে দাঁড়ায়। বিজেপির অভূতপূর্ব ঝড়ে ২৯৪ আসনের বাংলা বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮০টি আসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নির্বাচনের মাত্র এক মাসের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের তৈরি করা দলটির ওপর থেকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দলের ১০০ জনেরও বেশি কাউন্সিলর ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে বিধানসভায়; যেখানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় মমতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে ৬০ জনেরও বেশি বিধায়ককে সাথে নিয়ে বিধানসভায় আলাদা বিরোধী দলনেতা (এলওপি) হয়েছেন, যা বর্তমানে বেড়ে ৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, কাকলি ঘোষ দস্তিদার দলের ২৮ জন এমপির মধ্যে ২০ জনেরও বেশি সদস্যের সমর্থন দাবি করে কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ (NDA) সরকারকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এই চরম দলত্যাগ বিরোধী আইনের ফাঁদে পড়ে দল ও প্রতীক হারানোর ক্যাচ-২২ বা উভয়সংকট পরিস্থিতিতে পড়েছেন মমতা।
নয়াদিল্লিভিত্তিক সিনিয়র সাংবাদিকদের ও ‘ইন্ডিয়া টুডে’-র কলকাতা ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ডুবন্ত তৃণমূল কংগ্রেসকে বাঁচাতে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সোনিয়া গান্ধী মমতাকন্যাকে দুটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রথম প্রস্তাব অনুযায়ী, তৃণমূলকে কংগ্রেসে একীভূত করলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সহ-সভাপতি করা হবে। আর দ্বিতীয় প্রস্তাবটি হলো, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া হবে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের পদ।
অন্যদিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও কংগ্রেসের সামনে নিজস্ব কিছু শর্ত রেখেছেন, যার মধ্যে অন্যতম হলো মল্লিকার্জুন খাড়গেকে সরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজ্যসভায় পাঠিয়ে উচ্চকক্ষের বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দেওয়া। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই একীভূতকরণের মাধ্যমে মমতা জাতীয় রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবেন এবং প্রবাস ও নিজ রাজ্যে একাকী হয়ে পড়া ভাতিজা অভিষেকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে।
তবে এই একীভূতকরণের গুঞ্জনে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরের প্রধান ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “আমাদের ৬৪ জন বিধায়ক এবং ২০ জন এমপির কেউই কংগ্রেসের সাথে মিশে যাবেন না। ফলে একীভূতকরণের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।” শিবসেনার এমপি সঞ্জয় রাউত অবশ্য সব দলছুট অংশকে কংগ্রেসে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। ইতিহাস কি তবে সত্যিই বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে চলেছে? যে মমতা একসময় পশ্চিমবঙ্গ থেকে কংগ্রেসকে নিশ্চিহ্ন করেছিলেন, তিনি কি শেষ পর্যন্ত নিজের দলটিকে সেই মূল জাহাজেই নোঙর করাবেন, তা দেখার জন্য আগামী দিনগুলোর দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো উপমহাদেশ।
জান্নাত সকালবেলা
|