যে দশ প্রস্তাবের ওপর দাঁড় করানো হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেট

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ০৫:০৫ অপরাহ্ণ
যে দশ প্রস্তাবের ওপর দাঁড় করানো হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেট

নিজস্ব প্রতিবেদক:দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল রূপান্তর, টেকসই আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে প্রধান দশটি কৌশলগত অগ্রাধিকার বা মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড় করিয়েছে সরকার। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় সংসদে বাজেট পেশকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই সুনির্দিষ্ট ‘দশ প্রস্তাব’ বা এজেন্ডা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।

আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘সামষ্টিক অর্থনীতি, বাজেট রূপরেখা ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ খতিয়ান’ এবং ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, সামষ্টিক প্রবৃদ্ধি ও ব্যাংক ঋণ উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে অর্থমন্ত্রীর ঘোষিত সেই ঐতিহাসিক ১০টি মূল প্রস্তাবের চুলচেরা খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

বাজেটের মূল ভিত্তি যে ১০টি প্রধান প্রস্তাব:

সবার জন্য উন্নয়ন: সর্বস্তরের, সর্বশ্রেণির, সব অঞ্চলের এবং সর্বখাতের সুষম অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশে একটি সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন, টেকসই ও প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা।

সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষায় বাস্তবমুখী, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, দক্ষতা-নির্ভর ও নৈতিক মূল্যবোধভিত্তিক আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে তরুণ প্রজন্মকে যোগ্য মানবসম্পদে রূপান্তর করা এবং সবার জন্য মানসম্পন্ন সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (Universal Health Coverage) নিশ্চিত করা।

সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা: একটি মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি মজবুত করতে সব বয়সের ও সব স্তরের অভাবী ও যোগ্য নাগরিকদের জন্য টেকসই ‘জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী’ বা সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলা।

বিনিয়োগ-নির্ভর, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি: পরিকল্পিত টেকসই শিল্পায়ন, রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা, যুবসমাজের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং কৃষিকে খাদ্য নিরাপত্তার কৌশলগত খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

বিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং সাশ্রয়ী ও সহজিকৃত ব্যবসার পরিবেশ: সরকারি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কাজে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব পরিহার করে ‘বিনিয়ন্ত্রণকরণ’ বা ডি-রেগুলেশনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী ব্যবসা-সহায়ক (Ease of Doing Business) পরিবেশ গড়ে তোলা।

আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা: দেশের ব্যাংকিং ও সামগ্রিক আর্থিক খাতে কঠোর শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করে আমানতকারীদের হারানো আস্থা ও ব্যাংকের দায়বদ্ধতা ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের (Stock Market) কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা।

জ্বালানি নিরাপত্তা: দেশের শিল্প ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি একটি সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, পরিবেশবান্ধব ও সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ: একটি ভবিষ্যৎমুখী, গতিশীল ও প্রযুক্তিগতভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের আইটি খাতকে শক্তিশালী করা এবং বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি বা আইসিটি (ICT) রফতাতনিকারক দেশে রূপান্তর করা।

প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে বনায়নকে একটি সবুজ বিপ্লবে রূপান্তর করা, নদীসমূহের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং দেশব্যাপী আধুনিক ড্রেজিং ও খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু করার মাধ্যমে একটি পরিবেশ-সহনশীল বাসযোগ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।

স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা: দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে মেধাভিত্তিক ও সম্পূর্ণ জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং একই সাথে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন ও সরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়নকে শতভাগ দক্ষ, দুর্নীতিমুক্ত ও কার্যকর করে তোলা।

৫৫তম বাজেটের সামষ্টিক রূপরেখা ও ঘাটতি খতিয়ান

‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ মূল প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পেশ করা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত এই বিশাল জাতীয় বাজেটের মোট আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে সরকারের মোট অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই বিশাল বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—উভয় উৎসের ওপর সুষমভাবে নির্ভর করার পরিকল্পনা সাজিয়েছে। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুদান খাত থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের সিংহভাগ অর্থাৎ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ হিসেবে এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য সরকারি খাত থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন বাজেটে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির (GDP) সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। এছাড়া আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নতুন অর্থবছরে দেশের বর্তমান লাগামহীন মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট সামষ্টিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নিয়মানুযায়ী, সংসদে উপস্থাপনের ঠিক আগে আজ দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ মন্ত্রিসভায় বাজেটটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয় এবং পরবর্তীতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এতে আনুষ্ঠানিক সম্মতি স্বাক্ষর প্রদান করেন।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন