যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সরাসরি সামরিক সংঘাতের দ্বিতীয় দিনে মধ্যপ্রাচ্যের আন্তর্জাতিক জলসীমায় এক বড় ধরনের ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে। হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন ওমান উপসাগরে চলাচলকারী একটি তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন নৌবাহিনীর ছোঁড়া শক্তিশালী মিসাইলের আঘাতে তিন জন ভারতীয় বেসামরিক নাবিক নিহত হয়েছেন। ইরান সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মার্কিনীদের দেওয়া সামুদ্রিক অবরোধের জেরে এই মারাত্মক হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুপুর ১টা ২৯ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘মেরিন ট্র্যাকিং, ওমান উপসাগর ক্রাইসিস ও ক্যাজুয়াল্টি খতিয়ান’ এবং ‘ইউএস নেভি কমান্ড, আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন ও গ্লোবাল কনফ্লিক্ট উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে এই নৌ-হামলার ঘটনা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্স আজ বৃহস্পতিবার এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ওমানের জলসীমায় হামলার শিকার হওয়া ‘সেত্তেবেল্লো’ (Settebello) নামের তেলবাহী ট্যাংকারটির ইঞ্জিন রুম লক্ষ্য করে গতকাল বুধবার মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে নিখুঁতভাবে মিসাইল ছোঁড়া হয়। ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি আঘাত হানার সাথে সাথে জাহাজের ইঞ্জিন রুমে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে এবং চারিদিকে দাউদাউ করে আগুন ধরে যায়। এই ঘটনার পর থেকেই তিন জন ভারতীয় নাবিক নিখোঁজ ছিলেন। আজ বৃহস্পতিবার ভারতের কেন্দ্রীয় জাহাজ চলাচল বিষয়ক মন্ত্রী সর্বনান্দ সোনোওয়াল অফিশিয়ালি নিশ্চিত করেছেন যে, নিখোঁজ থাকা ওই তিন ভারতীয় নাবিকের সবাই ইঞ্জিন রুমের ভেতরেই প্রাণ হারিয়েছেন।
পালাওয়ের (Palau) পতাকাবাহী ওই বাণিজ্যিক জাহাজটিতে সব মিলিয়ে মোট ২৮ জন ক্রু বা নাবিক কর্মরত ছিলেন, যার মধ্যে ২৪ জনই ছিলেন ভারতীয় নাগরিক। ওমানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সোহর বন্দর থেকে আনুমানিক ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজটি অবস্থান করার সময় আকস্মিক এই হামলার শিকার হয়। মার্কিন মিসাইলের আঘাতের পরপরই জাহাজটি থেকে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ডেস্কে জরুরি জীবন বাঁচানোর (SOS) আবেদন ও সাহায্যের অনুরোধ জানানো হয়।
পরবর্তীতে ওমানের রাজধানী মাসকাটে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি জরুরি পোস্টের মাধ্যমে জানায়, ওমানি কোস্টগার্ড ও উদ্ধারকারী দলের সহায়তায় জাহাজে থাকা ২৪ জন ভারতীয় নাগরিকের মধ্যে ২১ জনকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জীবিত ও নিরাপদে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। বাকি তিন জনের মরদেহ উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে।
ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিষয়ক বিখ্যাত ফার্ম ‘অ্যামব্রে’ (Ambrey) এই হামলার নেপথ্যের কারণ বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চরম যুদ্ধাবস্থা চলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলজুড়ে কঠোর নৌ-অবরোধ (Naval Blockade) আরোপ করেছে। মূলত ইরান এবং ইরানের সাথে সংশ্লিষ্ট ও তেল চোরাচালানে যুক্ত কোনো জাহাজকেই মার্কিন সেনারা এই রুট দিয়ে চলাচল করতে দিচ্ছে না। যেসব জাহাজ এই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ অমান্য করে হরমুজ প্রণালির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে, সেগুলোকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে প্রথমে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, আর নির্দেশ অমান্য করলে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত এই ভারতীয় ক্রু-সংবলিত জাহাজটিও মূলত মার্কিনীদের এই সামরিক অবরোধের সরাসরি শিকার হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বিমান হামলার পর পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানের আইআরজিসি কর্তৃক মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত ১৮টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার পর দুই দেশের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত আজ দ্বিতীয় দিনে রূপ নিয়েছে। এই আন্তর্জাতিক যুদ্ধাবস্থা ও হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকির মুখে এই মেরিটাইম হামলা বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।
জান্নাত সকালবেলা
|