আজ মঙ্গলবার (২ জুন) সকাল ৮টা ৪৭ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘জাতীয়’ ও ‘আন্তর্জাতিক কূটনীতি’ বিভাগের এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রীর এই প্রথম ভিভিআইপি (VVIP) সফর এবং এর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২১ ও ২২ জুন দুই দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া যাবেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর এটিই হবে তাঁর জীবনের প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক বিদেশি সফর। মালয়েশিয়ার বর্তমান দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বিশেষ ও আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে এই সফরটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে এক একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসবেন। এ ছাড়া তিনি কুয়ালালামপুরে অবস্থানরত বিশাল বাংলাদেশি প্রবাসী কমিউনিটির আয়োজনে একটি নাগরিক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন এবং দেশটির শীর্ষ ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের সাথে আরও কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বৈঠকে অংশ নেবেন।
এদিকে, অন্য একটি উচ্চপদস্থ সূত্র মারফত জানা গেছে, দুই দিনের মালয়েশিয়া সফর সফলভাবে শেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেখান থেকেই সরাসরি আরেকটি বন্ধুপ্রতীম দেশে সরকারি সফরে যেতে পারেন। তবে তিনি মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি প্রতিবেশী দেশ ভারত নাকি পরাশক্তি চীনে যাবেন, তা এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। এরই মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বেইজিং সফরে নিতে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তবে সফরের দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত টেবিল টক-এ রয়েছে। চীন সরকার চাইছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যেন আগামী ২৩ থেকে ২৬ জুনের মধ্যে তাদের দেশে চার দিনের এক মেগা সরকারি সফরে যান।
জানা গেছে, নতুন সরকারের এই প্রথম হাই-প্রোফাইল বিদেশ সফরে বিএনপি প্রশাসন তাদের বহুল আলোচিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (Bangladesh First) নীতির আলোকে প্রবাসী কল্যাণ, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, নতুন বাণিজ্যিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ নিরপেক্ষ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছে। মালয়েশিয়ার সাথে ঝুলে থাকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) সই, রপ্তানি বৃদ্ধি, বিশ্বমানের হালাল ফুড সার্টিফিকেশন, বন্ধ থাকা শ্রমবাজারের জটিলতা নিরসনসহ দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ার সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের নিবিড় ও পরীক্ষিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পর শুরুর দিকে যে কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল, মালয়েশিয়া তার মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে মালয়েশিয়া হচ্ছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির অন্যতম প্রধান ও বৃহত্তম শ্রমবাজার। বর্তমানে প্রায় ৯ লাখের বেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও বাংলাদেশি কর্মী সেখানে নির্মাণ, কলকারখানা, উৎপাদন ও সেবা খাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করছেন।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, দুই সরকারপ্রধানের ঐতিহাসিক বৈঠকে বাংলাদেশি সাধারণ কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি এবং মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটের শোষণমুক্ত একটি স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা নিয়ে অত্যন্ত কড়া আলোচনা হবে। কারণ, অতীতে নিয়োগকারী এজেন্সির অতিরিক্ত ফি, চুক্তিভঙ্গ, ভিসা জালিয়াতি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখার মতো নানাবিধ গুরুতর অভিযোগ প্রায়ই উঠেছে। নতুন গণতান্ত্রিক সরকার এই সমস্যাগুলোর স্থায়ী ও আইনি সমাধানে অত্যন্ত আন্তরিক।
এ ছাড়া এই সফরে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় সুস্বাদু আম রপ্তানির এক বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে। সেখানে বিশাল বাংলাদেশি কমিউনিটি থাকায় দেশের শীর্ষ ফ্রুটস রপ্তানিকারকরা মালয়েশিয়াকে আমের এক নতুন মেগা বাজার হিসেবে দেখছেন। হালাল ফুড সার্টিফিকেশন, উচ্চশিক্ষা খাতে কোটা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা গ্রিন এনার্জি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টিও এজেন্ডায় স্থান পেয়েছে।
সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই বিষয়ে বলেন, “বর্তমানে মালয়েশিয়ায় থাকা মোট বিদেশি শ্রমিকের মধ্যে একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে (প্রায় ৩৭ শতাংশ) রয়েছে। দুই দেশের বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বর্তমানে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। মালয়েশিয়া মূলত বাংলাদেশে পাম অয়েল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি করে এবং বিনিময়ে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও বিশ্বমানের ওষুধ আমদানি করে থাকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের এই বাণিজ্যিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এফটিএ (FTA) চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে সই হলে উভয় দেশের আমদানি-রপ্তানি শুল্কমুক্ত সুবিধায় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।”
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর এখন প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া পরবর্তী গন্তব্যের দিকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি মালয়েশিয়া সফর শেষ করে সেখান থেকেই সরাসরি ভারত কিংবা চীনে যান, তবে এটি তাঁর প্রথম ভিভিআইপি বিদেশ সফরের দ্বিতীয় অংশ হিসেবে গণ্য হবে, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে না ঝুঁকে সম্পূর্ণ ‘ভারসাম্যপূর্ণ ও নিরপেক্ষ’ অবস্থানের এক স্পষ্ট ও শক্তিশালী বার্তা দেবে।
গত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এলে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরণের দৃশ্যমান ঠান্ডা যুদ্ধ ও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ভারতের জন্য পূর্বে বরাদ্দকৃত একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে (EZ) আকস্মিকভাবে পরিবর্তন করে সামরিক অঞ্চলে রূপান্তর করা হয় এবং সেখানে তুরস্ক ও চীনকে যৌথভাবে আধুনিক গোলাবারুদ ও ড্রোন উৎপাদনে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক নিয়মে কোনো দেশকে বিনিয়োগের জন্য স্থান বরাদ্দ করার পর এভাবে তা একতরফা পরিবর্তন করা হলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ নিয়ে আস্থার সংকটে ভোগেন।
তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সব ধরণের কূটনৈতিক টানাপোড়েন মিটিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করে। ভারত সরকারও তাদের দীর্ঘদিনের এই প্রতিবেশীর সঙ্গে ‘জনকেন্দ্রিক ও পারস্পরিক সম্মানের’ ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে ইতিবাচক সাড়া দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নতুন দিল্লিতে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সফরে যান। সেই সফরেই মূলত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন দিল্লি সফর নিয়ে ভারতের উচ্চপর্যায়ের সাথে প্রাথমিক ও ফলপ্রসূ আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী পরাশক্তি চীনও চাইছে নতুন প্রধানমন্ত্রী যেন সবার আগে বেইজিং সফরে যান। তারেক রহমান যদি চীনে যান, তবে সেখানে তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (TRCMRP), মেগা অবকাঠামো, এনার্জি সেক্টর, শুল্কমুক্ত বাণিজ্য-বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট ও শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। নতুন সরকার চীনের সাথে সম্পর্ককে আরও গভীর ও দুর্নীতিমুক্ত করে লাভজনক করতে চায়। সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফরে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত ‘এক্সিম ব্যাংক’ তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থায়নে আনুষ্ঠানিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের এক শীর্ষ পদস্থ কূটনৈতিক এই বিষয়ে বলেন, “ভূ-রাজনৈতিক ও স্ট্র্যাটেজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ঢাকাকে সবসময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে বেইজিং। দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বে চীন কখনোই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বা রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো ধরণের হস্তক্ষেপ করেনি। বাংলাদেশও সবসময় ‘ওয়ান চায়না পলিসি’কে শক্তভাবে সমর্থন জানিয়ে এসেছে। দুই দেশের এই পারস্পরিক বন্ধনকে আরও গভীর করতে আমরা নতুন নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।”
নতুন গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই প্রথম বিদেশ সফরকে কেন্দ্র করে দেশের ভেতর ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। নতুন সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ দর্শনের মূল ভিত্তি হলো— একটি বাস্তববাদী, সম্পূর্ণ অর্থনৈতিককেন্দ্রিক এবং বৈশ্বিক চাপমুক্ত ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি বজায় রাখা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো— জাতীয় স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রেখে ভারত, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সমান্তরাল ও সমান দূরত্বের সুসম্পর্ক বজায় রাখা। বিশ্লেষকদের মতে, ভূ-কৌশলগত অবস্থানের কারণে ভারত ও চীনের মধ্যকার বৈরিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত চাপ সামলানো নতুন সরকারের জন্য একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা হবে। এ ছাড়া চীনের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ঋণের শর্তাবলি, সুদের হার এবং স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে, যাতে দেশ কোনোভাবেই ডেট-ট্র্যাপ বা ঋণের জালে না পড়ে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পূর্ণ আস্থা ধরে রাখতে হলে নতুন সরকারকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং শতভাগ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে, তবেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে পূর্ণ আস্থা পাবেন।
জান্নাত সকালবেলা