রামিসা হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ আজ, সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি বাবার

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১০:২২ পূর্বাহ্ণ
রামিসা হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ আজ, সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি বাবার

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের নিষ্পাপ শিশু রামিসাকে পাশবিক নির্যাতনের পর অত্যন্ত বর্বরোচিতভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত ক্লুলেস মামলার বিচারিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আজ দেশজুড়ে বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্যগ্রহণ (Witness Testimony) শুরু হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার (২ জুন) সকাল ১০টা ১৬ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘আইন-আদালত’ ও ‘জাতীয় অপরাধ’ বিভাগের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই স্পর্শকাতর মামলার আইনি প্রক্রিয়া ও আদালত প্রাঙ্গণের আবেগঘন পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে এই চাঞ্চল্যকর মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শুরু হয়। ট্রাইব্যুনালের মূল এজলাসে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর ঠিক আগে নিহত শিশু রামিসার পিতা ও এই মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে ক্ষোভ ও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি হাত জোড় করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার বুকটা যারা খালি করেছে, সেই খুনি ও নরপশু সোহেল রানা এবং তার সহযোগী স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের যেন এই আদালতে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ ফাঁসি দেওয়া হয়। আমি এই রাষ্ট্রের কাছে আমার নিষ্পাপ মেয়ের হত্যার চূড়ান্ত ন্যায়বিচার ভিক্ষা চাই।”

আদালত সূত্রে জানা গেছে, আজ নির্ধারিত দিনে আদালতে মামলার রাষ্ট্রপক্ষের বেশ কয়েকজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও টেকনিক্যাল সাক্ষী নিজেদের জবানবন্দি পেশ করবেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের তালিকায় রয়েছেন— আসামিদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডকারী বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট, ভিকটিমের ময়নাতদন্ত সম্পন্নকারী ও ফরেনসিক রিপোর্টের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক, ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা আলামত সংগ্রহকারী সুরতহাল কর্মকর্তা এবং পল্লবীর ওই ভবনের স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশীরা।

এদিকে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আজ সকাল পৌনে ৯টার দিকে মামলার প্রধান ও মূল অভিযুক্ত আসামি সোহেল রানাকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এবং তার অপরাধের প্রত্যক্ষ সহযোগী স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে কড়া পুলিশি পাহারায় ও প্রিজন ভ্যানে করে ঢাকা সিএমএম (CMM) আদালত চত্বরে আনা হয়। আদালতে পৌঁছানোর পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের নির্দেশে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় (Lockup) সাময়িকভাবে রাখা হয়েছে।

এর আগে গতকাল সোমবার (১ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল দুই আসামির উপস্থিতিতে তাদের বিরুদ্ধে আনীত সুনির্দিষ্ট ও দণ্ডবিধির একাধিক ধারার অভিযোগ (Charge Sheet) গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আদেশ প্রদান করেন। অভিযোগ গঠনের পরপরই একই দিন বিকেলে বিজ্ঞ আদালত মামলার মূল বাদীসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৭ জন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে আজ ২ জুন আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য জরুরি সমন (Summon) জারি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এরও আগে গত ২৪ মে ট্রাইব্যুনাল দুই আসামির বিরুদ্ধে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার দাখিল করা চূড়ান্ত চার্জশিট বা অভিযোগপত্রটি আইনি পর্যালোচনা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে আমলে নেন। একই দিনে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (CMM) আশরাফুল হকের আদালতে মামলার প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (SI) অহিদুজ্জামান দীর্ঘ তদন্ত শেষে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের নিখুঁত ডসিয়ার ও অভিযোগপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মামলাটি দ্রুত বিচার ও নিষ্পত্তির স্বার্থে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলায় আসামিদের অপরাধ প্রমাণে মোট ১৭ জনকে সাক্ষী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

মামলার এজাহার ও পুলিশি তদন্তের বিবরণ থেকে জানা যায়, নিহত শিশু রামিসা স্থানীয় পল্লবীর ‘পপুলার মডেল হাই স্কুল’-এর দ্বিতীয় শ্রেণির অত্যন্ত মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা প্রতিদিনের মতো নিজের ঘর থেকে বের হলে প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে এবং ফুসলিয়ে নিজেদের ফ্ল্যাটের ভেতরের রুমে ডেকে নেয়। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টা বেজে গেলেও রামিসা স্কুলেই না পৌঁছানোয় তার মা চারদিকে চরম খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে ভবনের অন্য ফ্ল্যাটের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আসামি সোহেল রানার বন্ধ ঘরের দরজার সামনে শিশু রামিসার ব্যবহৃত ছোট জুতো জোড়া দেখতে পান তিনি।

তখন রামিসার মা আতঙ্কিত হয়ে দরজায় অনবরত ধাক্কাধাক্কি ও ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাননি। সন্দেহ তীব্র হওয়ায় রামিসার মা-বাবা চিৎকার শুরু করলে অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন ছুটে এসে সম্মিলিতভাবে দরজার লক ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। ঘরে ঢুকেই তারা শিউরে ওঠেন; আসামির শোবার ঘরের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন এবং ঘরের ভেতরে রাখা একটি বড় প্লাস্টিকের বালতির পানি ও রক্তের ভেতর থেকে শিশুটির বিচ্ছিন্ন মাথাটি উদ্ধার করা হয়।

এই বীভৎস ঘটনার পরপরই উপস্থিত জনতা জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল দিলে পল্লবী থানা পুলিশ তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ঘাতক স্বপ্না আক্তারকে আলামতসহ হাতেনাতে আটক করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। তবে ঘটনার মূল হোতা সোহেল রানা ততক্ষণে ঢাকা থেকে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির (Cyber Tracking) সহায়তায় ডিবি ও পল্লবী থানা পুলিশের একটি চৌকস দল ঢাকা থেকে ধাওয়া করে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে মূল ঘাতক সোহেল রানাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই পাশবিক ও অমানবিক ঘটনায় গত ২০ মে ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। আজ সেই মামলারই প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন