আত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার ক্ষতিকারক দিক জানুন

প্রকাশ: সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ০৪:১৬ অপরাহ্ণ
আত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার ক্ষতিকারক দিক জানুন

লাইফস্টাইল ডেস্ক : আমাদের সমাজব্যবস্থায় আপন চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো কিংবা খালাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ের বন্ধন একটি দীর্ঘকালীন ও বহুল প্রচলিত সামাজিক প্রথা। পারিবারিক আত্মিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় রাখা, নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিখুঁতভাবে বজায় রাখা এবং পূর্বপুরুষের সম্পত্তি যেন পরিবারের বাইরে চলে না যায় এমন নানাবিধ মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণে এখনও অনেক রক্ষণশীল পরিবারে এই ধরণের আত্মীয়তার বিয়ের চল বেশ ভালোভাবেই টিকে রয়েছে। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও জিনতত্ত্বের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সামাজিকভাবে লাভজনক মনে হওয়া এই সিদ্ধান্তটি মূলত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক এবং মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

আজ সোমবার (১ জুন) বিকেল ৪টা ৪ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘লাইফ স্টাইল’ ও ‘চিকিৎসা বিজ্ঞান’ বিভাগের এক বিশেষ সচেতনতামূলক প্রতিবেদনে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের মারাত্মক ক্ষতিকারক দিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড (Bradford) শহরে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত অত্যন্ত নিখুঁত ও নির্ভরযোগ্য এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ‘ফার্স্ট কাজিন’ (First Cousin) বা একদম ঘনিষ্ঠ রক্তের আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ফলে জন্ম নেওয়া সন্তানদের কিছু মারাত্মক জেনেটিক (Genetic) বা বংশগত ত্রুটি এবং শারীরিক-মানসিক বিকাশগত ঝুঁকি সাধারণ শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়।

জিনবিজ্ঞানীরা এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, মানুষের শরীরের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জন্য দুটি জিন দায়ী থাকে। বাবা-মা উভয়ের শরীরে যদি সুপ্ত অবস্থায় একই ধরণের কোনো ত্রুটিপূর্ণ বা রোগাক্রান্ত জিন থাকে, তবে তাদের মিলনের ফলে সেই ত্রুটিপূর্ণ জিনটি সন্তানের শরীরে গিয়ে সক্রিয় রোগ হিসেবে প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ বেড়ে যায়। যেহেতু ফার্স্ট কাজিন বা আপন ভাইবোনের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বংশগত কারণেই ডিএনএ এবং জিনগত মিল অনেক বেশি থাকে, তাই তাদের বৈবাহিক মিলনে জন্ম নেওয়া সন্তানদের ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া, অন্ধত্ব, মূক-বধির বা বুদ্ধিবৈকল্যের মতো কিছু মারাত্মক বংশগত রোগের ঝুঁকিও আশঙ্কাজনকভাবে বেশি দেখা যায়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সাধারণ দূর সম্পর্কের জনগোষ্ঠীর মধ্যে যেখানে এ ধরনের জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি মাত্র ৩ শতাংশ, সেখানে আপন কাজিন দম্পতিদের সন্তানের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি সরাসরি দ্বিগুণ হয়ে ৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

যুক্তরাজ্যের এই বিখ্যাত ‘বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড’ (Born in Bradford) গবেষণায় দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় ১৩ হাজারেরও বেশি নবজাতক ও শিশুর সার্বিক স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সেই গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, কাজিন দম্পতির সন্তানদের মধ্যে অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় ভাষাগত বিকাশে (Speech Delay) কিছুটা বেশি সমস্যা দেখা গেছে। একই সাথে শিশুদের স্বাভাবিক বয়সে বসা, হাঁটা বা চেনার মতো নির্ধারিত বিকাশগত ধাপ (Developmental Milestones) অর্জনের হারও তুলনামূলক অনেক কম বা ধীরগতির ছিল। পাশাপাশি এই ধরণের শিশুদের শৈশব থেকেই অন্যান্য সাধারণ শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হসপিটাল ও চিকিৎসা সেবা গ্রহণের প্রয়োজন লক্ষ্য করা গেছে। তবে গবেষকরা এই বিষয়ে আশ্বস্ত করে জোর দিয়ে বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে সব কাজিন দম্পতির সন্তানই বাধ্যতামূলকভাবে স্বাস্থ্যগত সমস্যায় আক্রান্ত হবে; অনেক ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনও যাপন করতে পারে, তবে ঝুঁকির গ্রাফটি সবসময়ই উঁচুতে থাকে।

গবেষকদের মতে, এ ধরনের শারীরিক ঝুঁকির পেছনে শুধু এককভাবে কাজিনদের সরাসরি বিয়েই একমাত্র কারণ নয়। একই বন্ধ সম্প্রদায় বা নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ক্রমাগত বিয়ে হওয়ার ফলেও মানবদেহে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষতিকর জিনের বিস্তার ও ঘনত্ব অনেক বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীরা জিনতত্ত্বের এই ক্ষতিকর সামাজিক প্রবণতাকে ‘এন্ডোগামি’ (Endogamy) নামে অভিহিত করেন। এর ফলে রক্তের সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও একই বংশ বা গোত্রের মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি জেনেটিক ঝুঁকি সমানভাবে বিদ্যমান থাকতে পারে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই ইউরোপের বেশ কিছু দেশ কাজিনদের মধ্যে বিয়ের আইনি বৈধতা নিয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নরওয়ে সরকার ইতিমধ্যে আইন পাস করে এ ধরনের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং পার্শ্ববর্তী দেশ সুইডেনও একই ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আইন প্রণয়নের চূড়ান্ত উদ্যোগ নিচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য বা ব্রিটেন এখনই আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে বিয়ের আগে ‘জেনেটিক কাউন্সেলিং’ (Genetic Counseling) বা রক্ত পরীক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে যেকোনো দম্পতি বিয়ে করা বা সন্তান নেওয়ার আগেই তাদের ভবিষ্যৎ সন্তানের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে শতভাগ সচেতন হতে পারেন।

আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, যুগ বদলানোর সাথে সাথে বর্তমান নতুন শিক্ষিত ও সচেতন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও এক বড় ধরণের ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। উন্নত শিক্ষা, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং বৈশ্বিক সামাজিক যোগাযোগের বিস্তারের ফলে অনেক তরুণ-তরুণী এখন অন্ধ পারিবারিক প্রথা বা আত্মীয়তার সম্পর্কের চেয়ে জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, ক্যারিয়ার, মানসিক সামঞ্জস্য এবং পারস্পরিক আধুনিক বোঝাপড়াকেই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের শেষ কথা— কাজিনদের মধ্যে বিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বা আবেগের একটি বিষয় হলেও, ভবিষ্যৎ অনাগত সন্তানের সুন্দর জীবনের স্বার্থে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে প্রতিটি পরিবারের সচেতন থাকা জরুরি। তাই বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে জেনেটিক পরীক্ষা ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে একটি আধুনিক ও দায়িত্বশীল সমাজের প্রধান পদক্ষেপ।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন