পেনাল্টির আগে গোলকিপারকে কী চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন নেইমার?

প্রকাশ: সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ
পেনাল্টির আগে গোলকিপারকে কী চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন নেইমার?

স্পোর্টস ডেস্ক: ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে ব্রাজিলের বিদায় এবং ম্যাচের পরপরই সেলেসাওদের মহাতারকা নেইমার জুনিয়রের আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা ক্রীড়া বিশ্বে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। তবে এই বিদায়ের বিষাদের মাঝেই নরওয়ে ম্যাচের শেষ মুহূর্তের একটি নাটকীয় ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে ব্রাজিলের হয়ে পেনাল্টি শটটি নেওয়ার আগে নরওয়ের গোলকিপার ওরিয়ান নাইল্যান্ডের সঙ্গে মাঠে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও বাক্যবিনিময়ে মেতে উঠেছিলেন নেইমার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায়, পেনাল্টি নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে দুই ফুটবলার একে অপরের দিকে তাকিয়ে উসকানিমূলক কথা বলছেন। মাঠের তীব্র হট্টগোলের কারণে তখন সেই কথা শোনা না গেলেও, অবশেষে নেইমার ও নাইল্যান্ডের মধ্যে হওয়া সেই রোমাঞ্চকর কথোপকথন নিখুঁতভাবে প্রকাশ করেছে ব্রাজিলের বিখ্যাত টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ফান্তাস্তিকো’।

টেলিভিশনটির লিপ-রিডিং (ঠোঁট মেলানো) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পেনাল্টি স্পটে বল বসানোর পর নেইমার নরওয়ের গোলকিপারকে স্লেজিং বা বিভ্রান্ত করতে আত্মবিশ্বাসের সাথে হাসতে হাসতে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘(বলটা) কোন দিকে চাস? কোন দিকে মারব বল?’

নেইমারের এমন ওপেন চ্যালেঞ্জের মুখে মোটেও দমে যাননি নরওয়েজীয় গোলকিপার ওরিয়ান নাইল্যান্ড। তিনি পাল্টা হুংকার দিয়ে জবাবে বলেন, ‘পোস্টে, পোস্টে মার। তবে আমি এটা ঠেকিয়ে দেব! দেখে নিস আমি এটা আটকে দেব!’

উভয়ের এই চরম মনস্তাত্ত্বিক বাকযুদ্ধের পরই পেনাল্টি নেন নেইমার। নাইল্যান্ডের সব আত্মবিশ্বাস চূর্ণ করে নিজের চেনা দক্ষতায় এক নিখুঁত ও দর্শনীয় শটে বল নরওয়ের জালে জড়িয়ে দেন তিনি। গোলকিপার নাইল্যান্ড নিজের জায়গায় ডামি হয়ে দাঁড়িয়ে কেবল বলের জালের ঠিকানা খুঁজে নেওয়া দেখলেন, নড়ার সুযোগটুকুও পাননি। বল জালে জড়ানোর পরপরই তীব্র উল্লাসের বদলে নরওয়েজীয় গোলকিপারের সামনে গিয়ে আঙুল উঁচিয়ে নেইমার কড়া ভাষায় বলেন, ‘আমার সঙ্গে এই চালাকি চলবে না! আমার সঙ্গে নয়!’

তবে ম্যাচের প্রথমার্ধে যখন খেলা ০-০ গোলে সমতায় ছিল, তখন ব্রাজিলের পক্ষে পাওয়া প্রথম পেনাল্টিটি নিয়েছিলেন মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারায়েস। কিন্তু তাঁর নেওয়া বাঁ দিকের শটটি অসাধারণ দক্ষতায় ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন এই নাইল্যান্ডই। ম্যাচের শেষ দিকে ডিফেন্ডার কাসেমিরোর একক প্রচেষ্টায় আদায় করা দ্বিতীয় পেনাল্টি থেকে নেইমার গোল করতে সফল হলেও, তা কেবল ব্রাজিলের হারের ব্যবধানই কমিয়েছে (২-১), দলের বিদায় ঠেকাতে পারেনি।

পেনাল্টি থেকে নেওয়া নেইমারের এই গোলটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর গৌরবময় আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ গোল হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেল। ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের জনপ্রিয় ‘জিই টিভি’কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে নেইমার অশ্রুসিক্ত চোখে জানান, দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের যে দীর্ঘ লড়াই তিনি করে আসছিলেন, আজ মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই তার ‘চূড়ান্ত অবসান’ ঘটেছে।

নেইমার আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘আমি অনেক চেষ্টা করেছি, দেশের জন্য সাধ্যের সবটুকু উজাড় করে চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন সব শেষ। ১৬ বছর আগে এই মাঠেই দেশের হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম, আজ এখানেই শেষ করলাম।’ ম্যাচের পর ব্রাজিলের শীর্ষ গণমাধ্যম ‘গ্লোবো’সহ আন্তর্জাতিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম ফক্স স্পোর্টস, ইএসপিএন ও ট্রাইবুনা নেইমারের এই বিদায়ের খবরটি বিশ্বজুড়ে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রচার করেছে।

২০১০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হওয়া নেইমার দেশের হয়ে দীর্ঘ ১৬ বছরে মোট ১৩০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। যেখানে ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে তিনি করেছেন ৮০টি গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৫৯টি গোল। তবে এত সব অতিমানবীয় রেকর্ডের ভিড়েও ক্যারিয়ারে কখনো একটি বিশ্বকাপ ছোঁয়া তো হলোই না, এমনকি নিজের দেশকে একটি কোপা আমেরিকার শিরোপাও এনে দিতে না পারার এক বুক ভরা চিরন্তন আক্ষেপ নিয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন এই ব্রাজিলিয়ান ট্রাজিক হিরো।

মন্তব্য করুন