বরিশালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে চিকিৎসার টাকা চুরির অভিযোগ
সাঈদ পান্থ, বরিশাল
বরিশালের গৌরনদী সার্কেলের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)-এর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে এক শয্যাশায়ী ব্যক্তির বসতঘর থেকে চিকিৎসার টাকা চুরির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে কাল্পনিক মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয়ভীতি দেখিয়ে গত এক মাসে দুই দফায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীর পরিবার। তবে অভিযুক্ত ডিএনসি কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল পৌনে ৮টার দিকে জেলার উজিরপুর উপজেলার প্রত্যন্ত বিলাঞ্চল জল্লা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ওড়াবাশবাড়ি গ্রামের কামরুজ্জামান কালুর বাড়িতে এই অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী কালু বেশ কিছুদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী রয়েছেন। অভিযানে তাঁর ঘর থেকে কোনো ধরনের মাদকদ্রব্য উদ্ধার না হওয়ায় স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত এলাকাবাসীর তোপের মুখে পড়ে দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন সাদা পোশাকে আসা ডিএনসি সদস্যরা।
ভুক্তভোগী কালু ও তাঁর পরিবারের ভাষ্যমতে, ঘটনার দিন সকালে বসতঘরে তল্লাশির সময় সাদা পোশাকধারী ওই কর্মকর্তারা বিছানায় থাকা বালিশের নিচ থেকে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার জন্য জমানো ১৫ হাজার টাকা কৌশলে নিয়ে যান। শুধু তাই নয়, এর আগেও কালুকে মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয়ভীতি দেখিয়ে গত এক মাসে দুই দফায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এই চক্রের সদস্যরা।
এদিকে, ডিএনসির এই বিতর্কিত অভিযান চলাকালে স্থানীয় কয়েকজন তরুণ-তরুণী মোবাইলে ভিডিও ধারণ করলে অভিযান পরিচালনাকারীরা তাঁদের ফোনগুলো কেড়ে নিয়ে ভিডিওগুলো জোরপূর্বক মুছে দেন। যাদের ফোন নিয়ে ভিডিও ডিলিট করা হয়, তাদের মধ্যে একজন তরুণীও ছিলেন। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ভিডিও মুছে দেওয়ার অজুহাতে ডিএনসির সিপাহি খাইরুল ইসলাম ওই তরুণীর মোবাইল থেকে ব্যক্তিগত নাম্বার সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে নিজের পরিচয় গোপন রেখে ওই তরুণীকে ফোন করে অন্য এক মেয়ের মোবাইল নাম্বার চান সিপাহি খাইরুল। অভিযোগ রয়েছে, খাইরুল ওই তরুণীকে বলেন, “ওই মেয়েকে আমার পছন্দ হয়েছে, ওর মোবাইল নাম্বারটা আমাকে দেন। যদি না দেন, আমরা আগামীকাল (শুক্রবার) সকালে এসে আপনাদের বাড়ি-ঘরে আবারও মাদকবিরোধী অভিযান চালাবো।” এ নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এলাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন সকালে উপজেলার জল্লা ইউপির ওড়াবাশবাড়ি গ্রামের কামরুজ্জামান কালুর বসতঘরে মাদক উদ্ধারের নামে সাদা পোশাকধারী ৫ সদস্যের একটি দল হানা দেয়। প্রথমে তারা নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখলেও পরবর্তীতে স্থানীয়দের তোপের মুখে নিজেদেরকে গৌরনদী সার্কেলের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্য বলে পরিচয় দেন। পরে স্থানীয় ইউপি সদস্য ও গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে কালুর বসতঘরে পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি চালান ডিএনসির গৌরনদী সার্কেলের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. ফাইজুল ইসলাম হাওলাদার এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন টিমের সদস্য সিপাহি খাইরুল ইসলাম, রুবেল হোসেন, ফয়সাল হোসেনসহ আরও কয়েকজন।
তবে দীর্ঘ তল্লাশির পর কালুর বসতঘর থেকে বিন্দুমাত্র মাদকদ্রব্য উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন ডিএনসি কর্মকর্তারা। স্থানীয়দের দাবি, কালু অনেক বছর আগে মাদক সেবন করলেও দীর্ঘ ৫ থেকে ৬ বছর আগেই মাদক সেবন চিরতরে ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন।
ভুক্তভোগী কামরুজ্জামান কালুর স্ত্রী সুখী বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করে বলেন, “সকাল ৮টার আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ফাইজুল ইসলাম ও হৃদয়সহ ৪-৫ জন লোক আমাদের বাড়িতে এসে আমাকে ডেকে নিয়ে আমার শয্যাশায়ী স্বামীকে মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে ২০ হাজার টাকা দাবি করে। এ সময় তারা হুমকি দিয়ে বলে, ‘কালু ভালো হয়ে গেছে তাতে কী হয়েছে, ডোপ টেস্ট করলে যত বছর আগেই মাদক সেবন করুক তা বের হয়ে যাবে; এরপর ওরে বড় মামলায় ফাঁসিয়ে দেবো’।”
সুখী বেগম আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দাবিকৃত টাকা দিতে রাজি না হলে ডিএনসি কর্মকর্তারা তাঁর ও তাঁর মেয়ের সাথে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেন এবং বিভিন্ন ধরনের অকথ্য ভাষায় হুমকি দেন। তাদের এই চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে আশপাশের লোকজন বাড়িতে ছুটে আসেন। এরপরেই ফাইজুল ইসলাম ঘরে তল্লাশির কথা বলেন। স্থানীয়দের উদ্যোগে গ্রাম পুলিশ নাজির হোসেনকে ডেকে আনা হলে তাঁর উপস্থিতিতে ঘর তল্লাশি চালানো হয়, কিন্তু অবৈধ বা মাদকজাতীয় কিছুই উদ্ধার করতে পারেনি তারা। সুখী বেগম তাঁর শয্যাশায়ী স্বামীর চিকিৎসার টাকা চুরির এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত কর্মকর্তাদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
ঘটনার বিষয়ে জানতে প্রত্যক্ষদর্শী গ্রাম পুলিশ নাজির হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “কালুর বাড়িতে সাদা পোশাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এসেছিলেন। পরে স্থানীয়রা আমাকে ফোন করলে আমি সেখানে যাই। তবে কালুর ঘর তল্লাশি করে কোনো ধরনের মাদক উদ্ধার করা হয়নি।”
অভিযান পরিচালনার কথা স্বীকার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) গৌরনদী সার্কেলের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. ফাইজুল ইসলাম হাওলাদার মুঠোফোনে দাবি করেন, কামরুজ্জামান কালুর বসতঘর তল্লাশি চালিয়ে কোনো মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়নি; মূলত এটি একটি ‘নিষ্ফল অভিযান’ ছিল। তবে বসতঘর তল্লাশির সময় টাকা চুরি এবং এর আগেও দুই দফায় লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেন তিনি।
অভিযানে গিয়ে তরুণীর মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে গভীর রাতে ফোন দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধকে ‘জঘন্যতম কাজ’ আখ্যায়িত করে এসআই ফাইজুল বলেন, “সিপাহি খাইরুলের এ ধরনের কর্মকাণ্ড সত্যিই ঘৃণ্যতম। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
এ বিষয়ে বরিশাল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. তানভীর হোসেন খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গৌরনদী সার্কেল থেকে সকালে একটি অভিযান পরিচালিত হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন, তবে সেটি উজিরপুরে কি না তা তাঁর তৎক্ষণাৎ জানা ছিল না। অভিযানে গিয়ে ঘর থেকে টাকা চুরি ও মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, “খোঁজখবর নিয়ে বিস্তারিত দেখছি। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্ত উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফাইজুল ইসলাম হাওলাদার দীর্ঘ সাত বছর ধরে একাই গৌরনদী সার্কেলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। একই স্টেশনে বছরের পর বছর ধরে শেকড় গেড়ে বসে থাকার সুবাদে তিনি ও তাঁর অনুসারী টিম প্রায়ই সাদা পোশাকে উজিরপুর ও আগৈলঝাড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। তবে এসব দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা নিরসনে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত অপরিহার্য বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।