জুলাই চেতনার দুই বছর: ঐক্যের বাংলাদেশ কীভাবে বিভক্তির মুখোমুখি?
অনলাইন ডেস্ক : ঠিক দুই বছর আগের ৫ আগস্ট ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় ঐক্যের এক অভূতপূর্ব ও অনন্য দিন। সব রাজনৈতিক মতপথ, শ্রেণি ও ধর্মীয় বিভেদ ভুলে এদেশের আপামর জনতা এক সুতোয় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল স্বৈরাচার থেকে মুক্তির আকুল আকাঙ্ক্ষায়। বৈষম্যমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার সুদৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল লাখো মানুষ। সেই জনসমুদ্রের মূল নায়ক ছিল দেশের সাধারণ জনগণ; কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর একক এজেন্ডা সেখানে ছিল না। তারা চেয়েছিল একটি সাম্যের দেশ, যেখানে সুশাসন, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে।
কিন্তু সেই ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর আজ আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে? গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির ঠিক আগের দিন, ৪ আগস্ট ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা। ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী, যা ২৪-এর পর দুই প্রধান ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাত। যাদের হাতে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বোনা হয়েছিল, আজ তারাই পরস্পরের বিরুদ্ধে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। ৫ আগস্টের মূল চেতনা যেখানে ছিল সর্বজনীন জাতীয় ঐক্য, সেখানে আজ বাংলাদেশ হাঁটছে চরম বিভক্তি ও অবিশ্বাসের এক বিপরীতমুখী পথে।
দেশ আজ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামাজিকভাবে বহুমুখী ধারায় বিভক্ত। এক পক্ষ অন্য পক্ষের মতামতকে ন্যূনতম শ্রদ্ধা জানাতে রাজি নয়। রাজনীতি আটকে পড়েছে প্রতিহিংসা আর সংকীর্ণতার চোরাগলিতে। জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে বর্তমানে নির্বাচিত সরকার ও বিরোধীদল মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে; এমনকি বিরোধীদল থেকে সরকার পতনের প্রকাশ্য হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক এই অস্থিরতার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে।
বেসরকারি খাতকে ‘আমার লোক’ ও ‘সাবেক সরকারের দোসর’—এমন নানা তকমায় ভাগ করে অচল করে রাখা হয়েছে। শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, নতুন বিনিয়োগের অভাব এবং ব্যাপক বেকারত্বের কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে কোটি কোটি মানুষ। শিক্ষাঙ্গনে বিদ্যার পরিবেশের চেয়ে পদ-পদবি ও প্রভাব বিস্তারের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ জমেছে তরুণদের মনে। তদুপরি, আইনের শাসনের জায়গায় চেপে বসেছে ‘মব জাস্টিস’ বা মবের শাসন, যার ফলে নারী নিরাপত্তা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত।
প্রশ্ন ওঠে, কেন এই অভূতপূর্ব ঐক্য ধরে রাখা সম্ভব হলো না? কেন সুবর্ণ সম্ভাবনার দুয়ারে এসে পথ হারাল গণ-অভ্যুত্থানের স্বপ্ন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় গত ১৮ মাসের ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলের দিকে। ২৪-এর আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. ইউনূস ঐক্যের বার্তা দিলেও বাস্তবে তাঁর ১৮ মাসের শাসনকাল ছিল চরম হতাশার। দেশ পরিচালনায় রাষ্ট্র সংস্কারের দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কৃত্রিম দূরত্ব তৈরি এবং সুশীল সমাজের আড়ালে রাজনৈতিক কূটকৌশল জাতীয় ঐক্যকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। সুশাসন ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি; উল্টো দুর্নীতি, লুটপাট ও নতুন ধরনের ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের উত্থান ঘটেছে।
শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে গণমাধ্যম ও ক্রীড়াঙ্গন—সব ক্ষেত্রেই বিভাজনের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করার মতো ঘটনা ঘটেছে। সময়মতো জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা না করে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থার প্রাচীর তুলে দেওয়া হয়, যার খেসারত আজ দিতে হচ্ছে বর্তমান নির্বাচিত সরকার ও সাধারণ জনগণকে।
২৪-এর ৫ আগস্টে যে ঐক্যের বাংলাদেশে নতুন ভোরের সূর্য উঠেছিল, আজ তা আচ্ছন্ন অশুভ বিভাজনের মেঘে। দেশের মানুষ যখনই একতাবদ্ধ হয়েছে, তখনই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক অর্জনকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারায় দেশের অগ্রযাত্রায় মারাত্মক ছেদ পড়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে হিংসা, বিভাজন ও প্রতিহিংসার নোংরা পথ পরিহার করে পুনরায় একতা, সুশাসন ও গণতন্ত্রের চর্চায় ফিরে আসাই এখন সময়ের একমাত্র দাবি।
|