অবিনশ্বর ছায়ার খোঁজে: জীবনের রণক্ষেত্র আর এক লৌকিক ব্যস্ততার গল্প
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ০৩:৫৩ অপরাহ্ণ
শরীফুন্নেছা বেবী: আমাদের যাপিত জীবনের পথচলা এক পরম রহস্য। কার গন্তব্য কতটা দূরে, সেই হিসাব আমাদের কারও জানা থাকে না। অথচ আমাদের স্বপ্নগুলো ডানা মেলে বহুদূরের আকাশে। এক অদ্ভুত, অবিরাম ছুটে চলা এই জীবন; যেখানে কোনো দাঁড়ি-কমা ছাড়াই হঠাৎ একদিন সব স্তব্ধ হয়ে যায়। চেনা পৃথিবীর মায়া, কোলাহল আর ব্যস্ততা ছেড়ে আমরা পা বাড়াই এক অনন্তকালের উদ্দেশ্যে—যে গন্তব্য চিরকালই আমাদের অজানা।
জীবন এক চিরন্তন রণক্ষেত্র: এই জীবন আসলে সুখ-দুঃখের এক সুবিশাল রণক্ষেত্র। একটু ভালো থাকা, একটুখানি সুখের খোঁজে আমাদের প্রতিনিয়ত যুদ্ধ আর সংগ্রাম করে যেতে হয়। অদ্ভুত এই লড়াইয়ে জড়িয়ে আমরা কত কী-ই না করি! কখনো পাওয়ার আনন্দ, কখনো না-পাওয়ার বেদনা, কখনো বা স্বপ্ন আর ভালোবাসার জন্য চলে এই যুদ্ধ। এমনকি কখনো কখনো মানুষের মনের সংকীর্ণতায় অন্যের অনিষ্ট করার জন্যও তৈরি হয় যুদ্ধের ঘুঁটি। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে, বুঝে কিংবা না বুঝে আমরা লড়েই চলি—কখনো বাঁচার লড়াই, কখনো মরার লড়াই।
প্রতিদিন এই পৃথিবীতে কত নতুন গল্প তৈরি হয়, কত নতুন ঘটনা ঘটে! অথচ আমাদের একঘেয়ে যান্ত্রিক জীবনের আবর্তে আমরা তার খোঁজ রাখি না। জীবনের হাজারো প্রতিকূলতা জয় করে আমরা এগিয়ে যাই, আবার কখনো কখনো হেরে গিয়েও এক চরম জীবনজ্ঞান লাভ করি।
লৌকিক ব্যস্ততা ও আপনজন হারানোর ক্ষত: এই পথচলায় আমাদের দিতে হয় কত শত বিসর্জন। গ্রাস করে এক অদ্ভুত, কৃত্রিম ব্যস্ততা। আর এই লৌকিক ব্যস্ততার আড়ালে পড়ে আমরা অবহেলায় ভুলে যাই আমাদের সবচেয়ে আপনজনদের। মাঝে মাঝে স্বার্থপরতার ভিড়ে আমাদের নিজস্ব দায়িত্ববোধটুকুও লোপ পায়।
তখনই মনে পড়ে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা, মনে পড়ে জন্মদাতাদের। বিশেষ করে এই জুন মাসটা এলেই মনটা এক চরম হাহাকারে ভরে ওঠে। এই জুন মাসেই আমি হারিয়েছি আমার আব্বাকে। একজন সন্তান হিসেবে আব্বার জন্য কিছুই করতে পারিনি—এই আক্ষেপ আজীবন রয়ে যাবে। চারপাশের নানান পরিস্থিতি আর কারণের অজুহাতে দিনশেষে কষ্টটাই বেশি দিয়েছি আমার আব্বাকে।
নিঃস্বার্থ ভালোবাসার স্বর্গীয় ছায়া: অহেতুক আর কৃত্রিম ব্যস্ততার মোহে পড়ে আমরা হারিয়ে ফেলি আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় দুটি স্তম্ভ—আম্মা আর আব্বাকে। অথচ এই স্বার্থপর পৃথিবীতে বুকভরা নিঃস্বার্থ ভালোবাসা একমাত্র তারাই দিতে পেরেছিলেন। আজ জীবনের সবচেয়ে কঠিন আর অসহায় মুহূর্তগুলোতে যখন চারিদিকে অন্ধকার নেমে আসে, তখন বড্ড বেশি করে আম্মা-আব্বার সেই চেনা ছায়াটা খুঁজি। কিন্তু কোথাও আর তাঁদের পাওয়া যায় না।
আজ বুঝতে পারি, আমার আম্মার মতো মা হওয়া কিংবা আব্বার মতো বাবা হওয়া কতটা কঠিন! পরম ভাগ্যগুণে আমি এমন মা-বাবা পেয়েছিলাম, যাঁরা নিজেদের উজাড় করে দিয়ে আমাদের আগলে রেখেছিলেন।
পরিশেষ: এই পৃথিবীতে মা-বাবার ছায়াটা যেকোনো স্বর্গের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান। মহান আল্লাহর দরবারে এই মোনাজাত—তিনি যেন পৃথিবীর সকল মা-বাবাকে ভালো রাখেন, শান্তিতে রাখেন। আর যাঁরা চলে গেছেন, তাঁদের যেন পরম শান্তিময় জান্নাত নসিব করেন।
|