সরকারি আদেশে আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিল, সংসদে মন্ত্রী বললেন স্থগিত
অনলাইন ডেস্ক: রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে ৬ নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির লাইসেন্স নিয়ে সরকারি আদেশ ও খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা গেছে। গত ১১ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক প্রজ্ঞাপনে হাসপাতালটির লাইসেন্স সরাসরি 'বাতিল' করার ঘোষণা দিলেও জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী দাবি করেছেন, লাইসেন্স বাতিল নয়, বরং 'স্থগিত' করা হয়েছে।
আজ রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল আদ্-দ্বীন হাসপাতাল প্রসঙ্গে সরকারের এই অবস্থান তুলে ধরেন।
সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “অনেক সম্মানিত সংসদ সদস্য আদ্-দ্বীন হাসপাতাল নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁরা বলেছেন, মাত্র দুই থেকে আড়াইশ টাকায় তারা ডায়ালাইসিস সেবা দিয়ে থাকে—এটি সত্যি (ট্রু)। উনারা প্রশ্ন তুলেছেন, মাথাব্যথার জন্য কি মাথা কেটে ফেলা যায়? নো, মাথা কাটা যায় না। তবে যারা মাথা কাটে, তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। এটি কেউ অস্বীকার করতে পারেন না।”
গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর সেই ভয়ংকর পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “আদ্-দ্বীনে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, আপনারা সমালোচনাকারীরা কেউ সেখানে যাননি, অথচ আজ সংসদে বড় বড় কথা বলছেন। ছয়টি শিশু যখন চার হাত-পা ছুড়াছুড়ি করে বিছানায় বাঁচার জন্য কাঁদছিল, তখন তারা মূলত হাইপার-ক্যাপনিয়ায় (রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া) আক্রান্ত হয়েছিল। কারণ ওই সময় এসি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ঘরটিতে কোনো জানালা ছিল না, চারপাশ কাঁচ দিয়ে পুরো লকড ছিল। সেখানে কোনো জরুরি অক্সিজেন সরবরাহও ছিল না। ১৬-১৭ জন মানুষ, মায়েরা কাঁদছিলেন ও ছুটাছুটি করছিলেন।”
তিনি আরও যোগ করেন, “সেই নিষ্পাপ শিশুগুলো অক্সিজেনের অভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইডের কারণে ছটফট করতে করতে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ে। অথচ হাসপাতালের মালিক পক্ষ তাদের একবার দেখতে পর্যন্ত যাননি। আমি ঘটনার পরদিন নিজে গিয়ে দুজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরাও একমত হয়েছেন যে, চরম অবহেলা ও অক্সিজেনের মারাত্মক সংকটের কারণেই শিশুগুলোর মৃত্যু হয়েছে। এমতাবস্থায় সরকার কি বসে থাকবে? আমরা দেশের সব বেসরকারি হাসপাতালকে কঠোর শৃঙ্খলার আওতায় আনতে চাই।”
মালিকপক্ষের অবহেলা ও একগুঁয়েমির কারণেই হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করে মালিকের স্ত্রীকে নতুন চিফ এক্সিকিউটিভ করা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “তারপরও আপনারা বলবেন ওরা ঠিক, আমরা ঠিক না। আমরা তো মাথা কাটতে বলিনি, শুধু লাইসেন্স স্থগিত করেছি। বিষয়টি বর্তমানে আমরা দেখছি, সরকার গুরুত্বের সাথে দেখবে। কিন্তু এই মানবিক ও স্পর্শকাতর ইস্যুটি নিয়ে দয়া করে কেউ দলীয়করণ করবেন না।”
অথচ নথিপত্র বলছে, গত ১১ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেওয়া কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এমনকি পরবর্তীতে আদ্-দ্বীনে চিকিৎসাধীন রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে ঢাকার অন্য ৬টি হাসপাতালকে দায়িত্ব দিয়ে অধিদপ্তর যে জরুরি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, সেখানেও আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স 'বাতিল' করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে লিখিত ছিল।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অক্সিজেনের স্বল্পতা ও কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি প্রমাণিত হওয়ায় বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২ এর ১১(২)(খ) ধারা অনুযায়ী এই লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল। তবে উক্ত অধ্যাদেশের ১২ ধারা অনুযায়ী, লাইসেন্স বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করার আইনি সুযোগ এখনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের রয়েছে।
|