ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর বারবার বিজয়ের রহস্য
অনলাইন ডেস্ক: ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েও বারবার নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতার মসনদে ফিরে এসেছেন। তবে আগামীকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর ২০২৬) অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দেশটির পার্লামেন্ট (নেসেট) নির্বাচনে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় এবং কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন তিনি।
১. ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ বা নিরাপত্তার প্রতীক ইমেজ: নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরায়েলের অস্তিত্ব ও সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষার একমাত্র অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে সাধারণ ভোটারদের কাছে উপস্থাপন করতে চরম সফল হয়েছেন। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের তীব্র বিরোধিতা, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় কঠোর সামরিক বাধা এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আপসহীন নীতিকে তিনি নিজ জনপ্রিয়তার মূল হাতিয়ার বানিয়েছেন।
২. কট্টর ডানপন্থী ও ধর্মীয় জোট গঠন: ইসরায়েলের নির্বাচন মূলত সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক ও কোয়ালিশন-ভিত্তিক। নেতানিয়াহু অতি-অর্থোডক্স (আল্ট্রা-অরথোডক্স) ইহুদি দল এবং চরম ডানপন্থী দলগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে দীর্ঘ মেয়াদে নিজের জোট সরকার টিকিয়ে রাখতে অনন্য সাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
৩. রাজনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা ও কৌশল: ব্যক্তিগত দুর্নীতির বিচারিক মামলা, দেশজুড়ে গণবিক্ষোভ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক চাপ সত্ত্বেও তিনি বারবার কৌশলগত চালে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কট্টর সমর্থক গোষ্ঠী যেকোনো পরিস্থিতিতে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ওপরই পূর্ণ আস্থা রাখে।
৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা ও অস্তিত্বের সংকট: ৭ অক্টোবরের নজিরবিহীন সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায় সরাসরি নেতানিয়াহুর ওপর চাপিয়েছেন দেশটির অধিকাংশ নাগরিক। নির্বাচনের আগের দিনগুলোতেও তেল আবিবের রাজপথে তাঁর পদত্যাগ দাবি করে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। তবে নেতানিয়াহু গাজা ও লেবাননে সামরিক আগ্রাসন এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ ঘাঁটিতে আঘাত হানার সাফল্যকে পুঁজি করে ভোটারদের পুনরায় নিজের দিকে টানার শেষ চেষ্টা করছেন।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট: এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর মূল চ্যালেঞ্জার হিসেবে উঠে এসেছেন সাবেক সামরিক বাহিনী প্রধান গাদি আইজেনকোট। তাঁর নতুন রাজনৈতিক দল 'ইয়াশার' (Yashar) জনমত জরিপগুলোতে চমক দেখাচ্ছে। যুদ্ধকালীন ক্যাবিনেট থেকে পদত্যাগ করা আইজেনকোট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—ক্ষমতায় এলে ৭ অক্টোবরের জাতীয় ব্যর্থতার নিরপেক্ষ স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করবেন।
সর্বশেষ জরিপ ও সম্ভাব্য ফলাফল (রাজনৈতিক অচলাবস্থা): ১২০ আসনের নেসেটে (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট) সরকার গঠনের জন্য আবশ্যক ৬১টি আসন পাওয়া কোনো পক্ষের জন্যই সহজ হচ্ছে না। নেতানিয়াহুর লিকুদ জোট: ভোটপূর্ব সর্বশেষ জরিপগুলোতে (যেমন Channel 12 ও Kan) নেতানিয়াহুর কট্টর জোট ৫০ থেকে ৫১টি আসন পেতে পারে। বিরোধী জোট: গাদি আইজেনকোট ও ইয়ায়ির লাপিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো যৌথভাবে ৫২ থেকে ৫৪টি আসন পেতে পারে।
কোনো পক্ষই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নির্বাচন পরবর্তীতে এক চরম রাজনৈতিক ডেডলক বা ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। আর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না এলে নেতানিয়াহু এমন জটিল পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করবেন, যাতে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনিই দীর্ঘ সময় ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেন।
২৭ অক্টোবর সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে এবং রাত ১০টায় বুথফেরত জরিপ (Exit Poll) প্রকাশ পাবে। পরবর্তীতে ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা ও নিশ্চিত করবে। বিশ্বজুড়ে এখন কৌতুহল—ভোটাররা কি ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করবেন, নাকি তাঁর কট্টর যুদ্ধনীতিতেই পুনর্নির্বাচিত করবেন।
সকালবেলা / নুসরাত