সৌদিকে সহায়তায় মার্কিন এআই লক্ষ্যবস্তু শনাক্তে কতটা দক্ষ স্মার্ট সিস্টেম

প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৬ অপরাহ্ণ
সৌদিকে সহায়তায় মার্কিন এআই লক্ষ্যবস্তু শনাক্তে কতটা দক্ষ  স্মার্ট সিস্টেম

অনলাইন ডেস্ক: ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি গোষ্ঠীর ধারাবাহিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে নিজ দেশের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা জোরদারে দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি নির্ভর গোয়েন্দা সহায়তা নিচ্ছে সৌদি আরব।

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদ মার্কিন প্রশাসনের কাছে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানালেও ওয়াশিংটন এতে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। তবে বিকল্প হিসেবে সৌদি বাহিনীকে রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য এবং এআই-চালিত লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ প্রযুক্তি সরবরাহ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সেপ্টেম্বর মাসে সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, এই উন্নত সামরিক প্রযুক্তি পরিচালনায় সহায়তার জন্য আনুমানিক ১০০ থেকে ২০০ জন অভিজ্ঞ মার্কিন সেনাসদস্য সৌদি আরবে অবস্থান করছেন, যারা একটি যৌথ কমান্ড সেন্টারের মাধ্যমে সৌদি কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রখ্যাত ‘প্রজেক্ট ম্যাভেন’ (Project Maven) কর্মসূচির অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে ‘ম্যাভেন স্মার্ট সিস্টেম’ বা এমএসএস। ২০১৭ সালে পেন্টাগনে শুরু হওয়া এই প্রযুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এটি লাইভ স্যাটেলাইটের ছবি, ড্রোন ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ এবং গোয়েন্দা সূত্রের হাজার হাজার ডেটা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্লেষণ ও সংকলন করতে পারে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (CSIS) মতে, অতীতে একজন বিশ্লেষকের কয়েক ঘণ্টার ভিডিও ফুটেজ দেখে শত্রুঘাঁটি বের করতে হতো। কিন্তু এমএসএস একই সাথে শত শত উৎসের উপাত্ত কয়েক সেকেন্ডে ভিজ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মে এনে সম্ভাব্য রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, সাঁজোয়া যান বা সন্দেহভাজন ড্রোনের উপস্থিতি চিহ্নিত করে। প্রযুক্তি বিশ্লেষক বিলাওয়াল সিধু এই ব্যবস্থাকে যুদ্ধক্ষেত্রের ‘গুগল আর্থ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা সামরিক পরিভাষায় অত্যন্ত কম সময়ে শত্রু ধ্বংস করার প্রক্রিয়া বা ‘কিল চেইন’ (Kill Chain) সম্পন্ন করে।

এত উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন হলেও ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। হুথি যোদ্ধারা সুনির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী ঘাঁটিতে অবস্থান না করে অনবরত স্থান পরিবর্তন করেন। সাধারণ কভার্ড ট্রাকে বসানো হালকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের ছোট ছোট বহর নিয়ে তাঁরা ইয়েমেনের তীব্র দুর্গম পাহাড়ি পথ ও গিরিখাত ব্যবহার করেন। ফলে এআই লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করলেও হামলা চালানোর আগেই যোদ্ধারা সেখান থেকে সরে যেতে সক্ষম হচ্ছেন। এ ছাড়া ধূলিঝড়, তীব্র বাতাস, মরুভূমির ভূপ্রকৃতির হঠাৎ পরিবর্তন এবং কৃত্রিম ভুয়া লক্ষ্যবস্তু (Decoy Targets) এআইয়ের অ্যালগরিদমকে খুব সহজেই বিভ্রান্ত করে ফেলছে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় দাঁড়িয়েছে এর নৈতিক ঝুঁকি। স্বায়ত্তশাসিত এআই লক্ষ্যবস্তু নির্দেশ করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের যাচাই-বাছাই (Human-in-the-loop) সর্বদা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সম্প্রতি ইরানে যুদ্ধের প্রাথমিক ধাপে এই এমএসএসের মাধ্যমে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ভুলবশত সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করায় শত শত নিরীহ শিশুর মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছিল। সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সঠিক নিশানার বদলে সামরিক ঝুঁকি ও বেসামরিক প্রাণহানি বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে।

সকালবেলা / নুসরাত